বাংলাদেশে মেনোপজ: শুধু একটি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন নয়
মেনোপজকে সাধারণত একজন নারীর মাসিক চক্রের সমাপ্তি হিসেবেই বর্ণনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি একটি তীব্র শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সময়কাল। বাংলাদেশে অধিকাংশ নারী চল্লিশের শুরুর বা মাঝামাঝি বয়সে মেনোপজের মধ্য দিয়ে যান, এবং তাদের অনেকেই জানেন না যে তাদের শরীরে আসলে কী ঘটছে বা কেন ঘটছে। পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, সামাজিক সহায়তার ঘাটতি আর সংসারের নানা দায়িত্বের চাপ মিলিয়ে অনেক নারীর কাছে এই সময়টা হয়ে ওঠে যন্ত্রণাদায়ক এবং একাকী এক অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে যে মেনোপজের উপসর্গগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তীব্র মাত্রার। নারীরা শরীরে, পেশিতে ও জয়েন্টে ক্রমাগত ব্যথা, চরম ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা আর হঠাৎ গরম লাগার (হট ফ্ল্যাশ) কথা বলেন। উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজ আর বিষণ্নতার মতো মানসিক উপসর্গও সাধারণ ব্যাপার। কুমিল্লায়, ঢাকার নিম্ন-আয়ের শহুরে এলাকায় এবং আরও অনেক জায়গায় এই উপসর্গগুলো নারীদের জীবনযাত্রার মানে গুরুতর প্রভাব ফেলে এবং তাদের প্রতিদিনের কাজকর্ম ব্যাহত করে (সুলতানা ও সালেহ, ২০২৫; মিলি প্রমুখ, ২০২৪)।
বাংলাদেশে মেনোপজের সবচেয়ে অবহেলিত দিকগুলোর একটি হলো মানসিক স্বাস্থ্য। ২০২০ সালের একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৯৬ শতাংশই বলেছেন যে মেনোপজের সময় তারা কোনো না কোনো মাত্রায় বিষণ্নতায় ভুগেছেন (হারুন প্রমুখ, ২০২০)। এই পর্যায়ে অনেক নারীই মানসিকভাবে কষ্ট পান, অথচ তাদের খুব কম সংখ্যকই কোনো ধরনের সহায়তা বা চিকিৎসা পান। বিষণ্নতা, মনখারাপ আর উদ্বেগকে প্রায়ই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় বা একেবারেই উপেক্ষা করা হয়। সচেতনতার অভাব এবং প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার ক্ষেত্রে যে সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্কের বোধ কাজ করে, তার কারণে নারীরা সাহায্য চাইতে যান না। ফলে বেশিরভাগ নারীই নীরবে এই কষ্ট সহ্য করে যান, কারণ তারা মনে করেন যা হচ্ছে তা মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।
মেনোপজ একজন নারীর নিজেকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রভাব ফেলে। প্রজনন জীবনের সমাপ্তি অনেকের কাছেই কষ্টকর, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিজের পরিচয় হারানোর অনুভূতি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ৬১ শতাংশ নারী বলেছেন তারা আর নিজেকে পুরোপুরি নারী মনে করেন না, আর ৯১ শতাংশ নারী বলেছেন মেনোপজের পর পুরুষদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে (গুডম্যান, ২০২০)। এই পরিবর্তন দাম্পত্য সম্পর্কেও চাপ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে এমন এক সংস্কৃতিতে যেখানে নারীত্বকে প্রজনন ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে দেখা হয়। কখনো কখনো মেনোপজ বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীদের পারিবারিক পরিসরে মানসিক, শারীরিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা মেনোপজ-অভিজ্ঞতাকে গড়ে তোলার একটি বড় নিয়ামক। কম শিক্ষিত, দরিদ্র বা গ্রামীণ নারীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম বয়সে বা অকালে মেনোপজ হওয়া এবং তার স্বাস্থ্য পরিণতি খারাপ হওয়ার প্রবণতা বেশি (গুডম্যান, ২০২০; হারুন প্রমুখ, ২০২০)। বাংলাদেশে এই বয়সসীমার অনেক নারীই গৃহিণী অথবা অনানুষ্ঠানিক খাতে শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত। জয়েন্টের ব্যথা, ক্লান্তি আর অনিদ্রার মতো উপসর্গ তাদের কাজ করার সামর্থ্য কমিয়ে দেয়, আর কেউ কেউ একেবারেই আয়মূলক কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, যা পরিবারে দারিদ্র্য ডেকে আনে।
বাংলাদেশে মেনোপজ আসলে স্বাস্থ্য, লিঙ্গ ও দারিদ্র্যের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। এর উপসর্গ নারীর শরীর ও মনকে আক্রান্ত করে ঠিকই, কিন্তু এর গভীরতম পরিণতি প্রায়ই দেখা যায় অর্থনৈতিক নির্ভরতা, ভাঙাচোরা সম্পর্ক আর অবনতিশীল স্বাস্থ্যে। মেনোপজকে যদি নিছক একজন নারীর ব্যক্তিগত জৈবিক বিষয় হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন এজেন্ডায় রূপান্তরিত করা যায়, তবেই বাংলাদেশের নারীরা মর্যাদার সঙ্গে, সুস্থভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতার মধ্য দিয়ে বার্ধক্যে পৌঁছাতে পারবেন।
লেখকঃ মিজানুর রহমান আকন্দ, অ্যাডভোকেসি স্পেশালিস্ট, সেরাক-বাংলাদেশ
তথ্যসূত্রঃ
Goodman, N. F. (2020). Menopause and mental health: Cultural silence and stigma. Climacteric, 23(3), 219–224.
Harun, M. A., Kabir, A., & Islam, M. S. (2020). Knowledge, attitude, and psychological symptoms of menopause among Bangladeshi women: Findings from a national survey. Asian Journal of Psychiatry, 54, 102–110.
Mili F. R., Rahman, S., & Chowdhury, A. B. (2024). Menopausal symptoms and health-related quality of life among women in Cumilla district, Bangladesh. BMC Public Health, 24(1), 1–12.
Sultana, N., & Saleh, F. (2025). Menopausal experiences among urban poor women in Dhaka, Bangladesh. Journal of Women & Aging, 37(1), 1–18.

