প্রতি বছর ১০০০ জন নারী নতুন করে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন
বাংলাদেশে নারীরা লজ্জা, সামাজিক কুসংস্কার, অর্থনৈতিক অসুবিধা কিংবা চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে চিকিৎসা গ্রহণ করেন না। তাই প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্তের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা কঠিন, বিভিন্ন গবেষণা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করা হয় যে এখনও প্রায় ১৭৫৪৭ জন ১৫-৬৪ বছর বয়সী নারী প্রসূতি ফিস্টুলা নিয়ে সমাজের আড়ালে জীবনযাপন করছেন। আর প্রতি বছর ১০০০ জন নারী নতুন করে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

দীর্ঘায়িত ও বাধাগ্রস্ত প্রসব সময়মতো চিকিৎসা না পেলে জন্মনালী এবং মূত্রথলি বা মলদ্বারের মধ্যে একটি ছিদ্র তৈরি হয়, একেই বলে অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা। আর এই রোগে আক্রান্ত নারীরা প্রস্রাব বা মল অবিরাম নিঃসরণের সমস্যায় ভোগেন এবং প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ, ব্যথা, বিষণ্ণতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, কলঙ্ক ও জীবিকা হারানোর মুখোমুখি হন। এটি প্রসবজনিত সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতগুলোর একটি, অথচ এটি মূলত প্রতিরোধযোগ্য।
ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কোথায়?
অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য এবং স্বাস্থ্যসেবায় অসম প্রবেশাধিকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যেসব নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে দূরে বাস করেন, তাঁদের জন্য দীর্ঘ যাত্রা, পরিবহন সংকট এবং জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসার খরচ যোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে গর্ভধারণ এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়, বিশেষত যেখানে কিশোরীদের শিক্ষা বা প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত হাওর, নদীতীরবর্তী ও দ্বীপাঞ্চলের নারীদের ক্ষেত্রে এই বাধাগুলো সবচেয়ে তীব্র রূপে দেখা দেয়। জরুরি চিকিৎসাসেবা কাছাকাছি না থাকলে, চিকিৎসাযোগ্য একটি সমস্যাই রূপ নেয় আজীবনের প্রতিবন্ধকতায়।
বাংলাদেশ সরকার তার নির্মূল কর্মসূচি চালায় চারটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভাগে, রংপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী, কারণ এসব অঞ্চলে হাওর, নদীতীর ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির প্রাধান্য বেশি। এসব এলাকায় ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকার কারণ মূলত ভৌগোলিক। মৌসুমি বন্যা, ভাঙাগড়ার মধ্যে থাকা নদীর চর এবং পাহাড়ি ভূমি সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো যেমন কঠিন করে তোলে, তেমনি টেকসই স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলাও কঠিন করে দেয়। এসব জেলায় বাল্যবিবাহের হার তুলনামূলক বেশি এবং প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণের হার কম, যা কঠিন প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায় এবং বিপদচিহ্ন শনাক্তকরণে বিলম্ব ঘটায়।
পরিসংখ্যান কীভাবে বদলেছে?
জাতীয় পর্যায়ের তথ্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ৩,৮০৭টি ফিস্টুলা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৩,০২৭ জন নারীর অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং ২,৭৯৫ জন সফলভাবে সুস্থ হয়েছেন, যা ৯২.৩ শতাংশ সাফল্যের হার নির্দেশ করে। শুধু ২০২৪ সালেই ২৩টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য ৭৩৫ জন রোগী ভর্তি হন, যাদের মধ্যে ৫৬৪টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় এবং ৫১৯টি সফল হয়, অর্থাৎ প্রায় ৯২ শতাংশ সাফল্যের হার।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এর এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিট এর সহকারী পরিচালক ডাঃ মোঃ মনজুর হোসেন জানান,
“ইতিমধ্যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার চালু করা হয়েছে। এছাড়া, সারাদেশে ২৩ টি ফিস্টুলা সেন্টার রয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে ফিস্টুলা স্ক্রিনিংয়ের জন্য চার-প্রশ্ন (4Q) চেকলিস্ট তৈরি করা হয়েছে যেন দ্রুত ও সহজে ফিস্টুলা রোগী চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করা যায়।”
এদিকে, ২০২৩ সালে ১৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য মোট ৬৮০ জন ফিস্টুলা রোগী ভর্তি হন। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট ৫২৬টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়, যার সাফল্যের হার ছিল ৯২.৪ শতাংশ (৪৮৬ জন)। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৫২.১ শতাংশের ছিল সাধারণ অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা, আর ৪৩.২ শতাংশের ছিল আইট্রোজেনিক ফিস্টুলা, অর্থাৎ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার কারণে সৃষ্ট ফিস্টুলা। নিশ্চিত হওয়া আইট্রোজেনিক ফিস্টুলা রোগীদের মধ্যে প্রায় ৫৩.৬ শতাংশের কারণ ছিল হিস্টেরেক্টমি বা জরায়ু অপসারণ অস্ত্রোপচার।
ডাঃ উম্মে হানি খন্দকার বলেন, “আয়াট্রোজেনিক ফিস্টুলা প্রতিরোধে আমাদের প্রয়োজন দক্ষ জনবল। সেক্ষত্রে ডাক্তারদের সিজারিয়ান প্রশিক্ষণের সর্বোচ্চ গুনগত মান নিশ্চিত করতে হবে এবং কাজের মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো দুর্বলতা থাকলে তা সময়মতো চিহ্নিত করে সংশোধন করা যায়।”
এর পাশাপাশি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে ফিস্টুলা রোগীদের পুনর্বাসন ও পুনরেকত্রীকরণ সহায়তা জোরদার করে চলেছে। এই কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালে ৩০০-র বেশি ফিস্টুলা রোগী কোনো না কোনো ধরনের পুনর্বাসন সহায়তা পেয়েছেন।
ভবিষ্যৎ করণীয়ঃ
এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, যেসব নারী ইতিমধ্যে ফিস্টুলায় আক্রান্ত কিন্তু লজ্জা, ভয় অথবা চিকিৎসার কথা না জানার কারণে লুকিয়ে থাকেন, তাঁদের খুঁজে বের করা। ২০২৪ সালে অনুমোদিত বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় কৌশলপত্র, Third National Strategy to End Obstetric Fistula (2023-2030), নারীদের নিজে থেকে সামনে আসার অপেক্ষা না করে সক্রিয়ভাবে তাঁদের খুঁজে বের করার দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়, যেখানে অগ্রভাগের স্বাস্থ্যকর্মী, মিডওয়াইফ ও কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকরা নারীদের দোরগোড়ায় পৌঁছান।
অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা প্রতিরোধযোগ্য। এটি এখনো ঘটে চলার বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ প্রসব শুধু চিকিৎসাগত বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও প্রজনন অধিকারেরও বিষয়, শুধু বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হাতে সময় আছে চার বছরেরও কম, তাই বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত সারা দেশে সক্রিয় রোগী শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা, যাতে প্রতিটি নারী, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, একটি প্রতিরোধযোগ্য আঘাত তাঁর জীবন বদলে দেওয়ার আগেই সময়মতো মানসম্মত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।
