আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ২০২৬: অনলাইন হয়রানির ফলে ঝুঁকিতে কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য

কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলতে গেলে তার শিক্ষা, নিরাপত্তা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু তার মানসিক স্বাস্থ্য কেমন আছে, সে অনলাইনে নিরাপদ বোধ করে কি না, কিংবা অপমান ও হয়রানির শিকার হলে কার কাছে সাহায্য চাইবে, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শৈশব ও কৈশোর শুধু বেড়ে ওঠার সময় নয়, নিজের পরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলারও সময়।

আজ ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধের পাশাপাশি কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই অধিকারের মধ্যে মানসিক সুস্থতা, সহিংসতা থেকে সুরক্ষা এবং নিজের শরীর ও জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও রয়েছে। অথচ ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তারের সঙ্গে কিশোরীদের জন্য নতুন এক উদ্বেগ হয়ে উঠেছে সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হয়রানি।

২০২৫ সালের ১২ আগস্ট বিএমসি সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০১৯-২০ সালের বাংলাদেশ অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং সার্ভের ৪ হাজার ৯৮৪ জন কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, আগের ১২ মাসে ৮ শতাংশ কিশোরী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের ১২ শতাংশের মধ্যে ছিল মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বা গুরুতর বিষণ্নতাজনিত ব্যাধি। আর সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীদের মধ্যে এ হার ছিল ৩১ শতাংশ। গবেষণায় হয়রানির শিকার কিশোরীদের এ ধরনের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সমন্বিত সম্ভাবনা প্রায় চার গুণ বেশি পাওয়া যায়।

হয়রানির ঘটনা যত বেড়েছে, বিষণ্নতার হারও তত বেড়েছে। পাঁচবার বা তার বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীদের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার হার ছিল ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে গবেষণাটি হয়রানি ও বিষণ্নতার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক দেখালেও, শুধু সাইবার বুলিংই বিষণ্নতার কারণ, এমন সিদ্ধান্ত দেয় না।

এই ফলাফল কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিয়েও ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি কিংবা শরীর নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য তাদের নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অপমানের ভয়ে তারা সম্পর্ক, সম্মতি, বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তন কিংবা প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলতেও সংকোচ বোধ করতে পারে। যদিও আলোচিত গবেষণায় এসব প্রভাব সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি, বিষয়গুলো কিশোরীদের সামগ্রিক সুরক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

সমস্যা হলো, হয়রানির শিকার কিশোরীদের অনেকেই পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানাতে ভয় পেতে পারে। অভিযোগের জন্য তাদেরই দোষারোপ করা হলে কিংবা অনলাইন ব্যবহার সীমিত করাকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা হলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যায়।

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তাই শুধু অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার নয়, সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জরুরি। পরিবারকে হতে হবে সহানুভূতিশীল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে নিরাপদ অভিযোগ জানানোর সুযোগ, আর প্রয়োজনের সময় কিশোরীদের জন্য সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার অর্থ শুধু তাকে বিদ্যালয়ে পাঠানো বা বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করা নয়। তার কথা শোনা, মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভয় ছাড়াই সাহায্য চাওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি। যে কিশোরী অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়ে নিজের কষ্টের কথা বলতে ভয় পায়, তার অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হোক এবারের দিবসের অন্যতম অঙ্গীকার।

Leave a Reply