নারীবান্ধব নিরাপদ যাতায়াত: ঢাকায় “মায়া রাইড” এর মত পরিবহন ব্যবস্থা আরো প্রয়োজন
ঢাকায় একজন নারী কোথাও যাওয়ার আগে শুধু দূরত্ব, সময় আর ভাড়ার হিসাব করেন না। অনেক সময় তাঁকে আরও একটি বিষয় ভাবতে হয়, রাস্তায় তিনি কতটা নিরাপদ থাকবেন? এই প্রশ্নটি কখনো চাকরি, কখনো পড়াশোনা, কখনো চিকিৎসা নেওয়া, আবার কখনো নিজের প্রয়োজনেই বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এটি শুধু ব্যক্তিগত ভয় নয়। ঢাকায় নারীর চলাচল নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন শ্রেণির নারীরাই গণপরিবহনে এবং রাতে হাঁটার সময় নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন। গণপরিবহনে হয়রানি একটি বড় উদ্বেগ। নিম্নআয়ের নারীদের জন্য অতিরিক্ত ভিড় ও পরিবহন খরচও বড় বাধা।
এই বাস্তবতায় নারীকেন্দ্রিক পরিবহন উদ্যোগ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। মায়া রাইডের ওয়েবসাইট ঢাকার নারীদের জন্য নারী চালকের মাধ্যমে বাইক ও স্কুটার যাত্রা, নারী-কেন্দ্রিক গাড়ি সেবা এবং স্কুলগামী শিশুদের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত পরিবহন সেবা দিচ্ছে। চালক ও সঙ্গীদের পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ঢাকার রাস্তায় নারীদের যাতায়াতের অস্বস্তি নিয়ে স্বামী-স্ত্রী ফাহাদ চৌধূরী ও জান্নাতুল ফেরদৌসের কথোপকথন থেকেই মায়া রাইডের ভাবনার শুরু। ২০২৬ সালের এপ্রিলে চালু হওয়া মায়া রাইড এখন নারী যাত্রীদের নারী বাইক ও গাড়িচালকের সঙ্গে যুক্ত করছে। স্কুলগামী শিশুদের জন্যও রয়েছে প্রি-বুকড পরিবহনসেবা। মাত্র চার মাসে প্রায় ৭০ জন নারী বাইক চালক প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ৩০০টির বেশি বাইক রাইড সম্পন্ন হয়।
তবে মায়া রাইড একা নয়। নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে আরও কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ ২০২৬ সালের আগস্টে চালু হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট রুটে নারী চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে নারীদের জন্য বাসসেবা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে Better Future for Women-এর সঙ্গে Uber-এর উদ্যোগ নারীদের রাইড-শেয়ারিং পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির দিকে নজর দিয়েছে।
ঢাকার মেট্রোরেল নিয়েও সাম্প্রতিক এডিবি গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত গণপরিবহন নারীদের চলাচলের ধরন বদলানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কমাতে পারে। এসব উদ্যোগ একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: নারীদের নিরাপদ বোধ করার জন্য কি আলাদা পরিবহন দরকার, নাকি বাংলাদেশের পুরো পরিবহনব্যবস্থাই এমন হওয়া উচিত যেখানে নিরাপত্তা সবার জন্য স্বাভাবিক বিষয়?
বিশ্বব্যাংক বিশ্লেষণে ২০২২ সালের ২৪ জেলার ৫ হাজারের বেশি নারীর একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে ৮৭ শতাংশ নারী অন্তত একবার হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানান। ৩৬ শতাংশ নারী গণপরিবহনে নিয়মিত যৌন হয়রানির কথা বলেছেন। ৫৭ শতাংশের কাছে গণপরিবহন ছিল সবচেয়ে অনিরাপদ জনপরিসর।
এসব তথ্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বা এসআরএইচআরের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ নিরাপদে চলাচল করতে না পারা মানে শুধু যাতায়াতে সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষা, কাজ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের ওপর। চলাচলের স্বাধীনতা তাই নারীর স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারেরও অংশ।
এর আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। নারীর জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারীদের চালক হিসেবে কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারজন চালক দিয়ে শুরু করে চার মাসে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে প্রায় ৭০ জন নারী মোটরসাইকেল চালক যুক্ত হন। এ সময় ৩০ জনের মতো সক্রিয় ছিলেন এবং ৩০০টির বেশি মোটরসাইকেল যাত্রা সম্পন্ন হয়।
তবে নারী-নির্ভর পরিবহনকে ঢাকার গণপরিবহনের নিরাপত্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। নারীদের জন্য আলাদা নিরাপদ বিকল্প প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে গণপরিবহনে হয়রানি বন্ধ, চালক ও কর্মীদের জবাবদিহি, নিরাপদ অবকাঠামো এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
তাই লক্ষ্য শুধু নারীদের জন্য কয়েকটি নিরাপদ যাত্রার ব্যবস্থা করা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ঢাকা তৈরি করা, যেখানে নিরাপদে চলাচল করতে নারীকে আলাদা ব্যবস্থা খুঁজতে হবে না।
