যখন প্রযুক্তি বদলায় সহিংসতার ধরন: টিজিবিভি নিয়ে বাংলাদেশের তরুণরা কতটুকু সচেতন?
যে সহিংসতাকে মানুষ ঘরের বাইরে ভয় পায়, সেই সহিংসতা যখন প্রযুক্তির মাধ্যমেও তাদের কাছে পৌঁছে যায়, তখন কী ঘটে? ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যখন প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, তখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারী ও কিশোরীদের হয়রানি, হুমকি, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনাও বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বা টিজিবিভি বর্তমানে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএ-এর ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে, যা ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়, দেখা গেছে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এমন নারীদের ৮.৩ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার টিজিবিভি-র নির্দিষ্ট কিছু ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, আর গত ১২ মাসে এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে ৫.২ শতাংশ নারীর। ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি—১৬ শতাংশ। জরিপে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা, ব্ল্যাকমেইল, সম্মতি ছাড়া ছবি বা যৌন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তরুণদের জন্য ঝুঁকিটি শুধু অনলাইন যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পর্ক, মতপ্রকাশ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এসব জায়গায় হুমকি, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার বা বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে তরুণ নারীরা তা প্রকাশ করতে ভয় পেতে পারেন, অনলাইন কার্যক্রম থেকে সরে যেতে পারেন বা নিজেদের আচরণ ও চলাফেরায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হতে পারেন।
২০২৬ সালে ইউএন উইমেনের বাংলাদেশভিত্তিক একটি উদ্যোগেও নারীদের অনলাইনে হয়রানির বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে উল্লেখ করা একটি গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৬৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট যৌন বা হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছেন। একই উদ্যোগে ট্রলিং, ডিপফেক এবং অনলাইন ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো নতুন ধরনের সহিংসতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তাই টিজিবিভি শুধু প্রযুক্তির সমস্যা নয়; এটি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বা এসআরএইচআরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসআরএইচআরের মধ্যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিজের শরীর ও জীবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সহিংসতা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকার অধিকার রয়েছে। সম্মতি ছাড়া যৌন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, যৌন হুমকি বা ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের মতো আচরণ এসব অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং এর প্রভাব অনলাইন জগতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও অনলাইন হয়রানির মতো বিষয় মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তবে শুধু আইন করলেই নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হবে না।
তরুণদের প্রয়োজন সঠিক ডিজিটাল ও এসআরএইচআর তথ্য, সহজলভ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, গোপনীয় সহায়তা এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা। অনলাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু ডিজিটাল পরিসরকে নিরাপদ করা নয়, এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতাকেও সুরক্ষিত করা। একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ তখনই সত্যিকার অর্থে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, যখন সেখানে অংশ নিতে গিয়ে তরুণদের নিজেদের গোপনীয়তা, মর্যাদা বা স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করতে হবে না।
সূত্র:
