এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ: কতটা উপকৃত হবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী?
একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেই মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজনের সময়ে সেখানে চিকিৎসা, সঠিক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারী, কিশোরী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার সংকট আরও জটিল। অনেক সময় পরিবার পরিকল্পনা, মাসিক স্বাস্থ্য কিংবা প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগও সীমিত থাকে। ফলে অসচেতনতা, সামাজিক সংকোচ এবং সেবার অপ্রতুলতা মিলে তৈরি হয় একাধিক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এমন বাস্তবতায় আগামী তিন বছরে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সরকারি পরিকল্পনা বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, শুধু কর্মী নিয়োগ করলেই কি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ হবে? বিশেষ করে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (এসআরএইচআর) নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে?
৩১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার আগামী তিন বছরে ৯৯ হাজার ৬৫৭টি স্বাস্থ্য ও কল্যাণ সহকারী পদ তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এর সঙ্গে বর্তমানে কর্মরত স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবারকল্যাণ সহকারী এবং কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের যুক্ত করে প্রায় দেড় লাখ কর্মীর একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গ্রামীণ এলাকায় এবং সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য ও কল্যাণ কেন্দ্রে তাঁরা কাজ করবেন।
এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন কার্যক্রমকে এক ছাতার নিচে আনা। বর্তমানে স্বাস্থ্য সহকারীরা মূলত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেন, পরিবারকল্যাণ সহকারীরা পরিবার পরিকল্পনা ও গর্ভনিরোধক বিতরণের দায়িত্ব পালন করেন এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরা প্রাথমিক ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা দেন। আলাদা ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে সমন্বিতভাবে কাজ করলে সেবার পুনরাবৃত্তি কমবে এবং যেসব পরিবার নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পায় না, তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ হতে পারে।
এসআরএইচআর-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিকল্পনার গুরুত্বও কম নয়। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভনিরোধক পদ্ধতি, মাতৃস্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্য এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা বলছে, চ্যালেঞ্জ এখনো বড়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১১৫। ২০২৫ সালের হিসাবে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা ছিল ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও একটি অংশের নারী এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা পাচ্ছেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৯। এই চিত্র স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতির বিষয়টিও সামনে আনে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের সংগঠনগুলো নিয়োগ কাঠামো, বেতন গ্রেড, দায়িত্বের পার্থক্য এবং তাঁদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ফলে নতুন কাঠামোয় দায়িত্ব বণ্টন, প্রশিক্ষণ, পেশাগত মর্যাদা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিকল্পনায় নতুন নিয়োগের ৮০ শতাংশ নারী রাখার অঙ্গীকারও রয়েছে। এটি ইতিবাচক হতে পারে। কারণ নারী স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক ক্ষেত্রে নারী ও কিশোরীদের সংবেদনশীল স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে কথা বলা এবং সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু কতজন কর্মী নিয়োগ পেলেন, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং দেখতে হবে, একজন কিশোরী প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পাচ্ছে কি না, একজন নারী সম্মানজনকভাবে পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিতে পারছেন কি না এবং একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী সময়মতো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন কি না।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সেবাকে সহজলভ্য, মানসম্মত, সমতাভিত্তিক ও অধিকারসম্মত করে তোলা।
