পুরুষ মানেই শক্ত হতেই হবে? নীরবতার আড়ালে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট

ছোটবেলা থেকেই অনেক ছেলেকে শেখানো হয়, কাঁদা যাবে না, দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না, পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। বড় হয়ে সেই ছেলেটিই যখন কর্মক্ষেত্রের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভোগেন, তখন নিজের কষ্ট প্রকাশ করাও তাঁর কাছে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সমাজের চোখে শক্ত থাকার এই প্রত্যাশা কি কখনো মানুষের নিজের যত্ন নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

বাংলাদেশে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। চাম ওয়েলনেসের পুরুষের বিষণ্নতা বিষয়ক লেখা এবং ইয়ুথ পলিসি ফোরাম বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত বাধাবিষয়ক নিবন্ধ এ আলোচনাকে সামনে এনেছে। তবে সমস্যাটি কেবল পুরুষের আবেগ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নীতির বাস্তবায়নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৯ সালের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এবং ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছিলেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ, আর নারীদের ক্ষেত্রে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্নতাজনিত রোগের হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের একক সমস্যা নয়।

চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। জরিপের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ চিকিৎসা নেননি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান থেকে শুধু পুরুষেরাই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং এগুলো দেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও যৌনস্বাস্থ্যের যোগসূত্র

চাম ওয়েলনেসের নিবন্ধে বলা হয়েছে, পুরুষের বিষণ্নতা সব সময় প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী প্রকাশ পায় না। কারও ক্ষেত্রে বিরক্তি, পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া, কাজে অতিরিক্ত ডুবে থাকা কিংবা শারীরিক অস্বস্তির মধ্য দিয়ে মানসিক কষ্ট প্রকাশ পেতে পারে। এসব লক্ষণ দেখেই বিষণ্নতা নিশ্চিত করা যায় না, তবে প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।

২০২২ সালে জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি গবেষণায় ৩১১ জন বিবাহিত পুরুষের ওপর জরিপ এবং ৬০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, যৌন সক্ষমতা, পুরুষত্ব ও যৌনসম্পর্কে প্রত্যাশা নিয়ে উদ্বেগ তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। গবেষণার আওতাভুক্ত এলাকাগুলোতে অনানুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবাদাতাদের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিও উঠে আসে। তবে এই ফলাফল দিয়ে দেশের সব পুরুষের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করা যাবে না।

এখানেই মানসিক স্বাস্থ্য এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বা এসআরএইচআরের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়। যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা, ভুল ধারণা কিংবা পুরুষত্ব প্রমাণের চাপ কাউকে সঠিক চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে। মানসিক চাপ আবার দাম্পত্য সম্পর্ক, পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রজননসংক্রান্ত যৌথ সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাধান শুধু সচেতনতা নয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকারবিষয়ক উদ্যোগে ক্ষতিকর লিঙ্গভিত্তিক ধারণা মোকাবিলা করতে হবে এবং নারী ও পুরুষ উভয়কে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু পুরুষদের কর্মসূচিতে যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং সমতা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি সাশ্রয়ী কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষিত সেবাদাতা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আইনি সুরক্ষা ও নীতিমালা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করাও জরুরি।

একজন পুরুষকে শক্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া সহজ। কিন্তু তাঁর কষ্টের কথা শোনা, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করাই প্রকৃত দায়িত্ব। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙতে হলে সমাজকে প্রথমে মেনে নিতে হবে, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং নিজের সুস্থতার অধিকার।

Leave a Reply