বন্যায় মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সংকটে – জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি

বন্যার খবর বলতে আমরা সাধারণত দেখি ডুবে যাওয়া বাড়িঘর, ক্ষতিগ্রস্ত ফসল কিংবা ভেঙে যাওয়া সড়কের ছবি। কিন্তু এই দুর্যোগের আরেকটি নীরব সংকট খুব কমই আলোচনায় আসে। সেটি হলো গর্ভবতী নারী, কিশোরী এবং প্রজননক্ষম নারীদের স্বাস্থ্যসেবা।

সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাবে, তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ১৪ হাজার গর্ভবতী নারী এবং প্রায় ২ লাখ ৯১ হাজার প্রজননক্ষম নারী। সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক নারী প্রয়োজনীয় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণত খাদ্য, আশ্রয় ও উদ্ধার কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকে একই গুরুত্ব না দিলে দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন-ক্যামকং বলেছেন, “দুর্যোগ এলেও গর্ভধারণ কিংবা সুরক্ষার প্রয়োজন থেমে থাকে না।” এই বক্তব্য এখন শুধু মানবিক আবেদন নয়, বরং জনস্বাস্থ্য নীতিরও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউএনএফপিএ এবং ল্যানসেটে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের সময় মাতৃমৃত্যু, গর্ভকালীন জটিলতা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, নিরাপদ স্যানিটেশন সংকট এবং পর্যাপ্ত আলো না থাকাও নারী ও কিশোরীদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করে।

বান্দরবানে এই মাসেই শত শত গর্ভবতী নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা তাদের জন্য নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করাকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরেও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে মানবিক সংস্থাগুলো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, ধাত্রী নিয়োগ, ডিগনিটি কিট, মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রী এবং মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো কেবল জরুরি সহায়তা হিসেবে নয়, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার স্থায়ী অংশ হওয়া উচিত।

আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (IPCC) সতর্ক করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে। তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু বাঁধ নির্মাণ বা আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা দুর্যোগের মধ্যেও মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যেতে সক্ষম।

কারণ, দুর্যোগের সময় একজন গর্ভবতী নারীর নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, এটি মানবাধিকার, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।

সূত্র – ইউএনএফপিএ 

Leave a Reply