নারীর মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই: শুধুই কি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যা, নাকি জনস্বাস্থ্যের অবহেলা?
কর্মস্থলে যাওয়ার আগে একজন নারী হয়তো ভেবে নেন, পথে কোথায় টয়লেট পাওয়া যাবে। দীর্ঘ যাত্রায় পানি কম পান করেন কেউ কেউ। আবার অপরিচ্ছন্ন বা নিরাপদ নয় এমন শৌচাগারের কারণে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টয়লেট ব্যবহার এড়িয়ে যান অনেকে। এসব সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত অভ্যাস বলে মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দৈনন্দিন জীবনের এমন পরিস্থিতি যখন নারীর স্বাস্থ্য ও স্বস্তিকে প্রভাবিত করে, তখন দায় কি শুধু তাঁর নিজের?
নারীর মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই নিয়ে আলোচনা এই প্রশ্ন সামনে আনে। সমস্যাটি সাধারণ হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য, নিরাপদ শৌচাগার এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
গবেষণা কী বলছে?
২০২১ সালে ঢাকার একটি বিশেষায়িত শিক্ষণ হাসপাতালে প্রজননক্ষম বয়সী ২৫০ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় ৪১ দশমিক ২ শতাংশের ইউটিআই পাওয়া যায়। অর্থাৎ, গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৫০ জনের মধ্যে ১০৩ জনের মূত্রনালিতে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। তবে এটি একটি হাসপাতালভিত্তিক গবেষণা। তাই এই হারকে বাংলাদেশের সব নারীর মধ্যে ইউটিআইয়ের হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইউটিআই হলে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ এবং তলপেটে অস্বস্তি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তবে অপরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার করলেই ইউটিআই হবে, এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালিতে প্রবেশ করলে এ সংক্রমণ হয়। নারীর শারীরিক গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে। টয়লেটের সংকট ও পানি কম পান করার অভ্যাস নারীর দৈনন্দিন স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু এগুলোকে সংক্রমণের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
টয়লেটের সংকটও স্বাস্থ্য ও অধিকারের প্রশ্ন
বাংলাদেশে স্যানিটেশন ব্যবস্থায় অগ্রগতি হলেও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন সুবিধা ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানটি সামগ্রিক জনসংখ্যার, শুধু নারীদের বা গণশৌচাগার ব্যবহারকারীদের নয়।
কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহনকেন্দ্র ও জনসমাগমস্থলে পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারযোগ্য এবং নিরাপদ টয়লেট নিশ্চিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব সুবিধা প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের প্রয়োজনের উপযোগী হওয়া দরকার।
এখানেই বিষয়টি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বা এসআরএইচআরের সঙ্গে যুক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিকার মানে শুধু চিকিৎসা পাওয়া নয়; নিজের শরীরের প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের পরিবেশও এর অংশ।
নীরবতা নয়, প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা
ইউটিআইকে অনেক সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা কিংবা যৌন আচরণের সঙ্গে ভুলভাবে যুক্ত করা হয়। এতে আক্রান্ত নারী লজ্জা বা সংকোচে চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারেন। অথচ সংক্রমণ কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যসমস্যা।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। উপসর্গ স্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা মূল্যায়ন।
নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাই শুধু পানি পান ও পরিচ্ছন্নতার পরামর্শ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জনসচেতনতা, সহজলভ্য চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সংবেদনশীল আচরণ এবং মানসম্মত শৌচাগার।
প্রশ্নটি শুধু নারীরা নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতটা সচেতন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সেবা নিশ্চিত করতে পরিবার, কর্মস্থল এবং রাষ্ট্র কতটা দায়িত্ব নিচ্ছে। নারীর স্বাস্থ্য ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।
