ন্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের আরও জোরদার করা প্রয়োজন
যে আইনে বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেই আইনের অধীনেও যদি কোনো শিশু বাল্যবিবাহের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার কার্যকর সুযোগ না পায়, তবে সেই আইন তাকে কতটা সুরক্ষা দিতে পারে?
২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন প্রণয়নের প্রায় এক দশক পরও বাংলাদেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় এই বৈপরীত্য একটি গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হতে পারে, অথচ সেই বিবাহ আইনগত স্বীকৃতি পেয়ে যেতে পারে। ফলে শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিলের কার্যকর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর একটি পর্যালোচনা এই সমস্যার ব্যাপকতা তুলে ধরেছে। ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১.৪ শতাংশ। অগ্রগতি হলেও বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক।
আইনের ১৯ ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ধারার অস্পষ্টতা আইনের সুরক্ষামূলক উদ্দেশ্যকে দুর্বল করতে বাধ্য করে, বিশেষত যখন দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক কলঙ্ক বিয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএ এই ব্যতিক্রমী বিধানটি বাতিলের সুপারিশ করেছে।
আইনটি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও শাস্তির আওতায় আনতে পারে, অথচ বাল্যবিবাহের শিকার শিশুদের নিজেদের বিয়ে বাতিলের জন্য সহজ ও কার্যকর পথ নিশ্চিত করে না। পাশাপাশি, বিয়ের ন্যূনতম বয়সেও বৈষম্য রয়েছে—মেয়েদের জন্য ১৮ বছর এবং ছেলেদের জন্য ২১ বছর। সংস্কারের মাধ্যমে এই ব্যতিক্রমী বিধান বাতিল, এবং বাল্যবিবাহের শিকার ব্যক্তিদের বিয়ে বাতিলের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, আর্থিক সহযোগিতা ও মানসিক-সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তবে শুধু আইন শক্তিশালী করলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে না। শিক্ষার সুযোগের অভাব ও আর্থিক সংকটও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বাড়ায়। ইউনিসেফের শিক্ষা-সংক্রান্ত সূচক অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ার বয়সী শিশুদের ৩৩.৯ শতাংশ শিক্ষার বাইরে, আর এই পর্যায়ে শিক্ষাসমাপ্তির হার মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ। তাই লক্ষ্যভিত্তিক উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত এবং ঝরে পড়া মেয়েদের পুনরায় শিক্ষায় ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ–ইউএনএফপিএর পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৫–১৯ বছর বয়সী প্রতি এক হাজার কিশোরীর মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিজের শরীরের উপর অধিকার ও স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কিশোর-কিশোরীবান্ধব যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাল্যবিবাহ বন্ধে শুধু আইন ও শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিশুদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ জন্য আইনের দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি বাল্যবিবাহের শিকার শিশুদের আইনি ও সামাজিক সহায়তা দিতে হবে এবং মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একটি আইনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর নয়, বরং কতটা কার্যকরভাবে শিশুদের অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে এবং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কতটা স্বাধীনতা পাচ্ছে? তার ওপর।
Sources:
