প্রজনন অধিকারের প্রশ্নঃ জলবায়ু পরিবর্তন যখন স্বাস্থ্যসেবায় আঘাত হানে
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমরা তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা কার্বন নিঃসরণের হিসাব কষি। খুব কম সময়ই মানবদেহ, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার আলোচনায় আসে। অথচ বাস্তবে পরিবেশগত দুর্যোগ প্রতিনিয়ত নির্ধারণ করে দিচ্ছে কে গর্ভনিরোধক পাবে, কে নিরাপদে সন্তান জন্ম দিতে পারবে, আর সংকটের সময় কার নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা বা তাপপ্রবাহ সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। নারী, কিশোরী ও লিঙ্গ-বৈচিত্র্যসম্পন্ন (Gender-diverse) মানুষের জন্য বিপদ বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, আয় বন্ধ হয়ে যায় এবং বাস্তুচ্যুতি বা দিসপ্লেসমেন্ট অনিবার্য হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার প্রায়ই গুরুত্বের তালিকার একেবারে নিচে নেমে যায়।
আন্তর্জাতিক পরিসরে জাতিসংঘ ধীরে হলেও এই বাস্তবতা স্বীকার করতে শুরু করেছে। UNFCCC-এর আওতায় জলবায়ু অভিযোজন আলোচনায় স্বাস্থ্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসছে, যদিও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এখনো নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। United Nations Environmental Programme এবং জাতিসংঘ পরিবেশ পরিষদ দেখিয়েছে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন বিদ্যমান বৈষম্য আরও গভীর করে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে, এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল জলবায়ু নীতির আহ্বান জানিয়েছে। UNFPA আরও স্পষ্টভাবে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন প্রজনন স্বায়ত্তশাসন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শারীরিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি, বিশেষ করে মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে। তবুও, এসব সংস্থার কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে, আর জলবায়ু আলোচনায় SRHR-এর অভাব প্রায়ই দেখা যায়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও এই বিচ্ছিন্নতার উদাহরণ। জলবায়ু পরিবর্তন জাতীয় এজেন্ডার কেন্দ্রে রয়েছে, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান বা মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান তার প্রমাণ। একই সঙ্গে মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও কিশোর স্বাস্থ্য নিয়ে আলাদা নীতিও আছে। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্র খুব কমই এক জায়গায় এসে মেলে। উপকূলীয় এলাকা বা বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোতে দুর্যোগের সময় নিরাপদ প্রসবসেবা ও গর্ভনিরোধকের ঘাটতি এখনো নিয়মিত ঘটনা। সমন্বিত নীতি না থাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্বব্যাপী গবেষণাও এই বাস্তবতাকে সমর্থন করে। ২০২১ সালের Lancet Countdown on Health and Climate Change দেখিয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের সময় অকাল প্রসব ও গর্ভকালীন জটিলতা বাড়ে। WHO-এর ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মাতৃমৃত্যুর হার বেশি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। Guttmacher Institute-এর Climate Change, Sexual and Reproductive Health, and Rights প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, দুর্যোগের পর সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ দ্রুত বাড়ে।
এই ভাঙন কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে ঘটে। রাস্তা ডুবে গেলে, ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে গর্ভনিরোধক শেষ হয়ে যায়, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারেন না, জরুরি প্রসূতি সেবা অধরাই থেকে যায়। গর্ভবতী মেয়েদের জন্য পরিবেশগত চাপ দ্বিমুখী বিপদ ডেকে আনে। অতিরিক্ত গরমে রক্তচাপ বেড়ে যায়, পানিশূন্যতা দেখা দেয়। বন্যায় সংক্রমণ, অপুষ্টি ও অনিরাপদ প্রসবের ঝুঁকি বাড়ে। মানসিক চাপও অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
বাস্তুচ্যুতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। UNHCR ও CARE-এর গবেষণা দেখিয়েছে, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি যৌন শোষণ, বাল্যবিবাহ ও পাচারের আশঙ্কা বাড়ায়। অতিরিক্ত ভিড়ের আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, আর সহিংসতার শিকারদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
যদি জলবায়ু অভিযোজন সত্যিই কার্যকর করতে হয়, তাহলে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যকে তার কেন্দ্রে আনতেই হবে। দুর্যোগ-সহনশীল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, চলমান ক্লিনিক, গর্ভনিরোধকের নিরাপদ সরবরাহব্যবস্থা এবং জরুরি সেবায় GBV প্রতিরোধকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। জলবায়ু অর্থায়নেও প্রজনন স্বাস্থ্যকে বিলাসিতা নয়, জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সংকট নয়। এটি প্রজনন ন্যায়ের সংকট। এই সত্য উপেক্ষা করার মূল্য দিতে হচ্ছে নীরবে, বারবার, মানুষের জীবন দিয়ে।
উৎসসমূহ:
১. জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (SRHR) সম্পর্কিত UNFPA প্রতিবেদন
২. জলবায়ু পরিবর্তন ও SRHR নিয়ে IISD প্রকল্প
৩. জলবায়ু সংকট ও SRHR সম্পর্কিত IPPF অবস্থান পত্র
৪. জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় SRHR সম্পর্কিত প্রতিবেদন
