স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় লজ্জা নয় – নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় করণীয়

নারীদের অধিকার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে কথা বলার এটাই সময়। তবুও বাস্তবতা হলো—সমাজের লজ্জা, সংকোচ আর দীর্ঘদিনের ট্যাবুর কারণে অনেক নারী আজও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে দূরে থাকেন। ফলে ছোট সমস্যাও কখনো কখনো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়।

চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নুসরাত জাহান দৃষ্টির মতে, বাংলাদেশে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যখাতে কিছু অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক নারী নীরবে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব ও সামাজিক সংকোচ নারীদের চিকিৎসা নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও তথ্য পেলে অনেক জটিলতা সহজেই এড়ানো সম্ভব।

নারীরা সাধারণত সাদা স্রাব, মাসিকের অনিয়ম, তলপেটের ব্যথা কিংবা বিভিন্ন সংক্রমণের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পর গর্ভধারণ, বন্ধ্যাত্ব বা গর্ভাবস্থার জটিলতা নিয়েও তারা চিকিৎসা নেন। কিন্তু লজ্জা বা ভয়ের কারণে অনেকেই সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন গোপন রাখেন। এতে রোগ জটিল আকার ধারণ করে, এমনকি বন্ধ্যাত্ব বা গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

এই নীরবতার পেছনে রয়েছে সামাজিক ট্যাবু ও খোলামেলা আলোচনার অভাব। আমাদের সমাজে এখনও নারীর যৌন স্বাস্থ্যকে ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে নারীরা সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হন এবং নিজেদের শরীর সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারেন না। এই অবস্থার পরিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কিশোরী মেয়েদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পরিবারে যদি উন্মুক্ত ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া হয়, তবে তারা নিজেদের শরীর, নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে। এতে অল্প বয়সে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, শারীরিক জটিলতা ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমে আসবে।

দাম্পত্য জীবনে সুস্থ ও সম্মানজনক সম্পর্কের জন্যও সচেতনতা অপরিহার্য। পারস্পরিক সম্মান, সম্মতি এবং খোলামেলা যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয় একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি। যৌন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং নিরাপদ সম্পর্ক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নারী-পুরুষ উভয়েরই থাকা জরুরি।

গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের জন্য সহজলভ্য, গোপনীয় ও সম্মানজনক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো, সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যশিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং সমাজে লজ্জা ও ভয়ের সংস্কৃতি ভাঙা—এই উদ্যোগগুলো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

Leave a Reply