মাতৃমৃত্যু হ্রাসে সাফল্য: ২০৩০ এর আগেই লক্ষ্য অর্জন করায় বাংলাদেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিনন্দন

একসময় বাংলাদেশে সন্তান জন্ম দেওয়া অনেক নারীর জন্য ছিল জীবন-মৃত্যুর লড়াই। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশুর জন্মে প্রায়  ৫৭৪ জন মা মারা যেতেন। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে এই সংখ্যা নেমে এসেছে  ১৩৬-এ

এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের বড় সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। যেসব মায়ের এখনো মৃত্যু হচ্ছে, তাঁদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে কোথায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

মাতৃমৃত্যু কমানোর এই অগ্রগতি কোনো একটি কর্মসূচির ফল নয়। পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন সেবা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা এবং কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্যের চিত্র বদলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বাংলাদেশের এই অগ্রগতিকে আঞ্চলিক স্বাস্থ্য পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল বাংলাদেশকে মাতৃমৃত্যু প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ১৪০-এর নিচে নামিয়ে আনার জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে। নির্ধারিত ২০৩০ সালের আগেই এই মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ১৪০-এর নিচে নামা এসডিজির মূল মাতৃমৃত্যু লক্ষ্যমাত্রা নয়। এসডিজি ৩.১ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যু প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ৭০-এর নিচে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার করেছে, কিন্তু সামনে এখনো বড় পথ বাকি।

সেই পথের কিছু বাধাও স্পষ্ট। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, ৮৮ শতাংশ নারী প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে অন্তত একবার গর্ভকালীন সেবা পেলেও চারবার বা তার বেশি গর্ভকালীন সেবা পেয়েছেন মাত্র ৪১ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ প্রসব প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায় হয়েছে।

২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের প্রাথমিক ফলেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। জাতীয়ভাবে মাত্র ৪৩.৩ শতাংশ নারী অন্তত চারবার গর্ভকালীন সেবা পেয়েছেন এবং ৭৭.৭ শতাংশ প্রসব প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তায় হয়েছে।

এখানেই মাতৃস্বাস্থ্যের সঙ্গে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বা এসআরএইচআরের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা যথেষ্ট নয়। একজন নারী সেখানে যেতে পারছেন কি না, খরচ বহন করতে পারছেন কি না, প্রয়োজনের সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না এবং সম্মানজনক ও মানসম্মত চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রাম ও শহরের ব্যবধানও উদ্বেগের বিষয়। ২০২৩ সালে জাতীয় মাতৃমৃত্যুর হার ১৩৬ হলেও গ্রামাঞ্চলে তা ছিল ১৫৭। অর্থাৎ ভৌগোলিক অবস্থান এখনো একজন নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

আগামী দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে মিডওয়াইফ বা ধাত্রীসেবার বিস্তার। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সে সময় সরকারি ৬,২১৫টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে মিডওয়াইফ ছিলেন ২,৫৫৭ জন।

তাই ৫৭৪ থেকে ১৩৬-এ নামার গল্পটি শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এটি পরবর্তী কাজের দিকনির্দেশনাও দেয়।

“অগ্রগতি সম্ভব” বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তা প্রমাণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কি প্রতিটি মা, প্রতিটি অঞ্চল এবং প্রতিটি পরিবারের কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে?

Leave a Reply