পোশাকশ্রমিকদের কাছে এম-আর সেবা কতটা সহজলভ্য?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে আনুমানিক ১৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২৩ লাখ নারী কর্মরত রয়েছেন, যা এই খাতের মোট ৩৩ লাখ থেকে ৪৪ লাখ শ্রমশক্তির প্রায় ৫২% থেকে ৫৫%। তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত এসব নারীর পক্ষে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের জন্য সময় বের করা কঠিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের বাইরে সীমিত সময় এবং এম-আর (MR) এর মতো সেবা ঘিরে থাকা সামাজিক সংকোচ—সব মিলিয়ে প্রয়োজনের সময়ে সেবা নেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু যে নারীরা দিনের বড় একটি সময় কর্মস্থলে কাটান, তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি যদি এই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রথমবারের মতো গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের প্রকল্প-সমর্থিত পোশাক কারখানার ক্লিনিকগুলোতে নারীশ্রমিকদের জন্য এম-আর (MR) সেবা দেওয়া শুরু করেন চিকিৎসকেরা। Improving Sexual and Reproductive Health and Rights in Dhaka (ISRHRD) প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং MR সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়।
প্রায় ১৫টি RMG কারখানার বহির্বিভাগীয় ক্লিনিকে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এসব ক্লিনিকে শুধু এম-আর(MR) নয়, পরিবার পরিকল্পনা,এম-আর পরবর্তী সেবা এবং লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা-সংক্রান্ত সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়ানো হয়। পাশাপাশি কারখানার ক্লিনিক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রেফারেল লিঙ্কেজ তৈরি করা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে কর্মীরা উচ্চতর সেবা নিতে পারেন এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
সেবা গ্রহণের পরিসংখ্যানও এর প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১৬,৮৬৫ জন MR সেবা এবং ৩২,৫১৭ জন এম-আর পরবর্তী সেবা গ্রহণ করেছেন। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, নারীদের কাছে সহজে পৌঁছানো যায় এমন প্রজননস্বাস্থ্যসেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এমন কর্মীদের জন্য, যাদের কাজের সময়সূচির কারণে কর্মস্থলের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে এম-আর (MR) সেবা সহজলভ্য করার বিষয়টি শুধু একটি ক্লিনিক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকার ওপর নির্ভর করে না। সেবা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রয়োজন বিবেচনায় প্রকল্পের আওতায় ৭৬৬ জন সেবাদানকারী এবং ২৯৬ জন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীকে এম-আর পরবর্তী সেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা-সংক্রান্ত সেবার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল মানসম্মত, অধিকারভিত্তিক এবং বৈষম্যহীনভাবে SRHR সেবা দেয়া।
তবে দেশের বৃহত্তর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন থেকে চার বছরে নিয়োগ খুবই সীমিত ছিল, একই সময়ে অনেক অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মী অবসর নিয়েছেন বা স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছেড়ে গেছেন। নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মীও সাম্প্রতিক সময়ে পর্যাপ্ত SRHR প্রশিক্ষণ পাননি।
এম-আর(MR)এর মতো সেবার ক্ষেত্রে এই জনবল সংকট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকলেও প্রশিক্ষিত সেবাদানকারী, যথাযথ কাউন্সেলিং, মানসম্মত সেবা এবং কার্যকর রেফারেল লিঙ্কেজ না থাকলে সেবা নিয়মিত ও নিরাপদভাবে পৌঁছে দেওয়া কঠিন হতে পারে।
পোশাক কারখানার ক্লিনিকগুলোতে এম-আর (MR) সেবা চালুর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কর্মস্থলের কাছাকাছি প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিলে নারীদের জন্য সেবাগ্রহণের বাধা কমানো সম্ভব।
তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য সামগ্রী, পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষিত সেবাদানকারী এবং কার্যকর রেফারেল লিঙ্কেজ—যাতে একজন পোশাকশ্রমিকের প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ তার কাজের সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে থেমে না যায়।
https://textiletoday.com.bd/storage/uploads/2022/12/health-care-for-rmg-workers-e1672464787368.jpg
