দলিত হাসপাতালের “অপরাজিতা কর্নার”: মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও যত্ন

একটি মেয়ের প্রথম মাসিকের সঙ্গে তার জীবনের একটি স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন আসে। কিন্তু সেই সময় অনেক মেয়ের হাতে থাকে না সঠিক তথ্য, থাকে না প্রশ্ন করার নিরাপদ জায়গা। বরং অনেকের অভিজ্ঞতায় থাকে ভয়, সংকোচ আর নানা ভুল ধারণা।

বাংলাদেশে প্রতি মাসে লাখো নারী ও কিশোরী মাসিকের মধ্য দিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলা এখনো সহজ নয়। তাই একটি হাসপাতালের ছোট্ট একটি জায়গাও কখনো কখনো বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।

খুলনার চুকনগরে দলিত হাসপাতালের “অপরাজিতা কর্নার: মাসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা কেন্দ্র” তেমনই একটি উদ্যোগ। এখানে কিশোরী ও নারীরা মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য, সচেতনতা, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় মাসিক ব্যবস্থাপনা সামগ্রী পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ইয়ুথ শেয়ার-নেট প্রকল্পের আওতায় দলিত এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করছে। এতে অর্থায়ন করছে অ্যাম্পলিফাইচেঞ্জ এবং সহায়তা দিচ্ছে রেডঅরেঞ্জ।

উদ্যোগটির মূল বার্তা খুব সহজ: মাসিক কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি স্বাস্থ্য ও অধিকারের বিষয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা কী বলছে?

বাংলাদেশের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা এমআইসিএস অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৮৫ দশমিক ১ শতাংশের কাছে শেষ মাসিকে প্রয়োজনীয় মাসিক ব্যবস্থাপনা সামগ্রী ছিল৮৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী বাড়িতে ব্যক্তিগতভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনা সামগ্রী পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু মাত্র ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, প্রথম মাসিকের আগে তারা মাসিক সম্পর্কে জানতেন।

কিশোরীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ শেষ মাসিকের সময় স্কুল, কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেনি।

অর্থাৎ শুধু মাসিক ব্যবস্থাপনার সামগ্রী থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন সঠিক তথ্য, নিরাপদ ও ব্যক্তিগত পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা এবং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ যেখানে মেয়েরা প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না।

ইউনিসেফও বলছে, বাংলাদেশে মাসিক নিয়ে এখনো নানা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ও ভুল ধারণা রয়েছে। স্কুলে যাওয়া, রান্না করা, বাইরে যাওয়া কিংবা কারও সঙ্গে মাসিক নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রেও অনেক মেয়েকে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়।

কেন অপরাজিতা কর্নারের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

অপরাজিতা কর্নারের গুরুত্ব এখানেই। একটি জায়গায় তথ্য, পরামর্শ, সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়ার সুযোগ মেয়েদের মাসিককে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে সাহায্য করতে পারে।

এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, এমন একটি উদ্যোগ মাসিককে শুধু “পরিচ্ছন্নতার বিষয়” হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও অধিকারের বিষয় হিসেবে সামনে আনে।

একজন কিশোরী প্রথম মাসিকের আগেই যদি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারে, তাহলে ভয় ও বিভ্রান্তি কমে। স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যদি সে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তাহলে ভুল তথ্যের বদলে সঠিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। আর একটি হাসপাতাল যদি মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কাজ করে, তাহলে সেটিও সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।

তাই অপরাজিতা কর্নারের মতো উদ্যোগ শুধু একটি হাসপাতালকেন্দ্রিক সেবা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও যুবকেন্দ্রগুলোতে এ ধরনের নিরাপদ ও সহায়ক ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।

মাসিক কোনো সমস্যা নয়, যা মেয়েদের লুকিয়ে রাখতে হবে। এটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্যপ্রক্রিয়া।

অপরাজিতা কর্নারের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তাটিও তাই সবচেয়ে সহজ: মাসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার।

Leave a Reply