গর্ভধারণে নারীর সিদ্ধান্ত কতটুকু? নারী গার্মেন্টস কর্মীদের প্রায় ৬৫ শতাংশ ১৮ বছরের আগেই গর্ভধারণ করছেন

ঢাকার বস্তি এলাকার সরু গলিতে সন্ধ্যা নামলে কাজ থেকে ফেরেন শত শত নারী শ্রমিক। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর, কিন্তু চিন্তার শেষ নেই। সংসার, সন্তান, সম্পর্ক—সবকিছুর মাঝখানে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটা কতটা আছে, সেই প্রশ্নটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা রুখসানা আক্তারের (ছদ্মনাম) গল্প সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। কাজের খোঁজে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি পান। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ে, তারপর কিশোরী বয়সেই গর্ভধারণ। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় খুব দ্রুত। এই গল্প একা নয়—পোশাকশিল্পের হাজারো তরুণী একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত আইসিডিডিআর,বি-এর একটি গবেষণা বলছে, পোশাক কারখানায় কাজ করা প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিক ১৮ বছর হওয়ার আগেই গর্ভধারণ করছেন। অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে প্রতি তিনজনের দুজনের বিয়ে হয়েছে আঠারোর আগেই। শুধু তাই নয়, প্রতি তিনজনের একজন জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন।

গবেষণাটি ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকার কড়াইল ও মিরপুর এবং গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার বস্তিতে পরিচালিত হয়। ১৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী ৭৭৮ জন নারী শ্রমিক এতে অংশ নেন। সময়ের সঙ্গে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনও দেখা গেছে। পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। জরুরি গর্ভনিরোধক সম্পর্কে জানার হারও বেড়েছে।

তবে এই অগ্রগতির মাঝেও বড় উদ্বেগের জায়গা রয়ে গেছে সহিংসতা। গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক নারী কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। ঘরেও একই চিত্র—স্বামীর সহিংসতা অনেকের জন্য নিয়মিত বাস্তবতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সহিংসতার শিকার নারীরা খুব কমই আনুষ্ঠানিক সহায়তা চান। পরিবার বা বন্ধুর কাছে সাহায্য চাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। ফলে সমস্যাগুলো ব্যক্তিগত গণ্ডির মধ্যেই থেকে যায়, কোনো সমাধানের পথে এগোয় না।

এই প্রেক্ষাপটে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। যেসব নারীর নিজের জীবনের বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ বেশি, তারা মানসিক ও যৌন সহিংসতা থেকে তুলনামূলক বেশি সুরক্ষিত থাকেন। এমনকি চলাচলের স্বাধীনতা থাকলেও শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি কমে।

একই সঙ্গে শিক্ষা ও সচেতনতার প্রভাবও স্পষ্ট। যেসব নারী অন্তত নয় বছর পড়াশোনা করেছেন বা তুলনামূলক বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কম। আবার যারা আগে থেকেই গর্ভনিরোধক ব্যবহার শুরু করেছেন, তাদের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

তবে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা এখনো সীমিত। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২২ শতাংশ কারখানায় স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা আছে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সরবরাহ আরও কম—মাত্র ১৪ শতাংশ কারখানায়।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নারীরা এখন বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন, কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে বিনিয়োগ ততটা বাড়েনি। সচেতনতা বাড়ানো, সেবা সহজলভ্য করা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

দিনের শেষে প্রশ্নটি তাই সহজ—নারীরা কি নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারছেন? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সহিংসতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ কমানো কঠিন। আর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে পরিবর্তনের পথ সেখান থেকেই শুরু হতে পারে।

Leave a Reply