সস্তা ন্যাপকিন, বড় ঝুঁকি: বাংলাদেশে আরও নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মাসিক পণ্যের বিকল্প প্রয়োজন

স্যানিটারি ন্যাপকিন কোনো বিলাসপণ্য নয়। মাসিকের সময় স্কুলে যাওয়া, কাজে থাকা কিংবা স্বাভাবিকভাবে দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে যাওয়ার জন্য এটি অনেক নারী ও কিশোরীর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী।

তাই বগুড়ায় সম্প্রতি অনুমোদনহীন পরিবেশে নিম্নমানের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির ঘটনা শুধু একটি ভেজাল পণ্যের খবর নয়। এটি বাংলাদেশের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা এমএইচএমের একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে।

১৬ আগস্ট ২০২৬ বগুড়ার ফুলদিঘী উত্তরপাড়ায় র‌্যাব-১২ ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে একটি বাসাবাড়িতে অনুমোদন ছাড়াই স্যানিটারি ন্যাপকিন ও বিভিন্ন সার্জিক্যাল পণ্য তৈরির তথ্য পাওয়া যায়। অভিযানে প্রতিষ্ঠানটিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং অবৈধ উৎপাদনস্থল সিলগালা করা হয়। কর্মকর্তারা জানান, ন্যাপকিনে অত্যন্ত নিম্নমানের তুলা ও সাধারণ টিস্যু ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্যাকেটেও উৎপাদনের ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছিল।

ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: যখন অনেক পরিবারের জন্য মাসে মাসে ন্যাপকিন কেনার খরচও চাপ তৈরি করে, তখন শুধু কম দামের কারণে কতটা সহজে নিম্নমানের পণ্য বাজারে জায়গা করে নিতে পারে?

বাংলাদেশের বাজারে দামের পার্থক্যও কম নয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অনলাইন তালিকায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট প্রায় ৩২ টাকা থেকে শুরু করে ১৮০ টাকা বা তার বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে। পণ্যের ধরন, আকার ও ব্র্যান্ড অনুযায়ী দাম আরও বাড়তে পারে।

২০২৫ সালের ওয়াটারএইডের একটি বাজার বিশ্লেষণেও দেখা যায়, বাংলাদেশে ডিসপোজেবল ন্যাপকিনের দাম পণ্যের ধরন ও প্যাকেটের আকার অনুযায়ী প্রায় ৩৫ টাকা থেকে ১,০০০ টাকারও বেশি হতে পারে। গবেষণাটি একই সঙ্গে বলছে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ন্যাপকিন তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হলেও সামাজিক সংকোচ এবং সচেতনতার অভাবে এর ব্যবহার এখনো সীমিত।

এখানেই নিরাপদ রিইউজেবল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ন্যাপকিন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, সঠিকভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ন্যাপকিন মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে। কক্সবাজারে ইউনিসেফ এমন ন্যাপকিন তৈরির প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগেও সহায়তা করেছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশের পাশাপাশি দক্ষতা ও আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ঘরে তৈরি মানেই নিরাপদ নয়। পুনর্ব্যবহারযোগ্য ন্যাপকিন তৈরিতে উপযুক্ত শোষণক্ষম কাপড়, ভালো সেলাই, পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে ধোয়া, সম্পূর্ণ শুকানো এবং পরিচ্ছন্নভাবে সংরক্ষণ জরুরি। ইউনিসেফও এসব ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

তাই সমাধান শুধু দামি ব্র্যান্ডের ন্যাপকিন কেনার পরামর্শ নয়। দরকার কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক লেবেল, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পণ্য, মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষা এবং মানসম্মত পুনর্ব্যবহারযোগ্য ন্যাপকিনের ব্যবহার বাড়ানো।

মাসিক নিয়ে সমাজে এমনিতেই অনেক সংকোচ আছে। এর সঙ্গে যদি নিরাপদ পণ্য পাওয়ার অনিশ্চয়তাও যোগ হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের কিশোরী ও নারীরা।

সাশ্রয়ী মাসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপদ মাসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনোভাবেই আপসের বিষয় নয়।

Leave a Reply