শিশুর প্রথম সুরক্ষা মায়ের দুধ – সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ কি যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করছে?

একটি শিশুর জন্মের পর প্রথম যে উপহারটি সে মায়ের কাছ থেকে পায়, সেটি শুধু খাবার নয়, জীবনের প্রথম সুরক্ষাও। চিকিৎসাবিজ্ঞান তাই মাতৃদুগ্ধকে প্রায়ই শিশুর “প্রথম টিকা” বলে অভিহিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি এখনো মাতৃদুগ্ধ নিয়ে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করা গেছে?

এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে। ১ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, “টেকসই জীবনের শুরুতে মাতৃদুগ্ধ, কার্যকর উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করি।”

অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেন, “শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই।” তিনি নবজাতককে জন্মের পরপরই শালদুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, অনেক শিশুই এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাঁর মতে, সিজারিয়ান প্রসবের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সচেতনতার ঘাটতি এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)ইউনিসেফ বলছে, জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে মাতৃদুগ্ধ পান শুরু করলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। আবার প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধ খাওয়ালে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও অপুষ্টির মতো বহু রোগের ঝুঁকি কমে যায়। তারপরও দেশে অনেক শিশু এখনো এই সুপারিশ অনুযায়ী মাতৃদুগ্ধ পায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ শুধু সচেতনতার অভাব নয়। অনেক কর্মজীবী মা পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেক কর্মস্থলে নেই স্তন্যদানবান্ধব পরিবেশ বা শিশুকে সঙ্গে রাখার সুযোগ। পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম দুধের বাড়তি প্রচার এবং নানা সামাজিক ভুল ধারণাও মায়েদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাতৃদুগ্ধকে শুধু পুষ্টির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর), মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতকের সুরক্ষা এবং নারীর অধিকার, সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। তাই শুধু মায়েদের দায়িত্বের কথা বললেই হবে না। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারকদেরও সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

দ্য ল্যানসেট ব্রেস্টফিডিং সিরিজ-এর গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃদুগ্ধ পান বাড়ানো গেলে শিশুদের অসুস্থতা কমে, শেখার সক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ও কমে। একই সঙ্গে WHO ও ইউনিসেফ বলছে, কার্যকর নীতি, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবারভিত্তিক পরামর্শ এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই মাতৃদুগ্ধ পানের হার আরও বাড়ানো সম্ভব।

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের এই আয়োজন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, শিশুর প্রথম টিকা যদি সত্যিই মাতৃদুগ্ধ হয়, তবে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল একজন মায়ের নয়। এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।

Leave a Reply