ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা – আমরা কি তরুণদের কথা শুনতে আসলেই প্রস্তুত?

কেউ বড় হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি পরিবারে, কেউ ঢাকার ব্যস্ত শহরে, আবার কেউ বেড়ে উঠছে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ কোনো এলাকায়। জীবনযাপনের বাস্তবতা আলাদা হলেও তরুণদের চাওয়াগুলো অনেকটাই এক। তারা চায় ভালো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কাজের সুযোগ, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।

এই অভিন্ন আকাঙ্ক্ষাকেই সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬। ১২ আগস্ট পালিত এ বছরের প্রতিপাদ্য “ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা”। জাতিসংঘ বলছে, তরুণদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও মর্যাদা, সুযোগ, স্বাস্থ্য, অংশগ্রহণ ও একটি টেকসই ভবিষ্যতের প্রত্যাশা প্রায় সবারই এক।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার বা এসআরএইচআর-এর সম্পর্ক খুবই গভীর। একজন তরুণের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেক সময় নির্ভর করে তার পরিবার, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর।

বাংলাদেশে শিশুবিয়ে কমেছে, কিন্তু কমার গতি এখনো যথেষ্ট নয়। ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। আর ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগেই।

এর প্রভাব শুধু বিয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশুবিয়ে অনেক কিশোরীর পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে পারে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমাতে পারে এবং বাল্যগর্ভধারণ ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক তথ্যও দেখায়, শিশুবিয়ে ও কিশোরী গর্ভধারণ বাংলাদেশের তরুণীদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, কিশোরী গর্ভধারণ কমাতে শুধু স্বাস্থ্যসেবা বাড়ালেই হবে না। শিশুবিয়ে বন্ধ করা, মেয়েদের শিক্ষায় ধরে রাখা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক তথ্য ও সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তাই এবারের প্রতিপাদ্যের “ভিন্ন প্রেক্ষাপট” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যন্ত এলাকার একজন কিশোরী, একজন বিবাহিত কিশোরী কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন তরুণের সমস্যা এক নয়। কিন্তু তাদের সবার “অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা” হলো নিরাপদ থাকা, নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারা এবং নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাওয়া।

পরিবর্তনের কিছু উদাহরণও আছে। ২০২৪ সালে ইউএনএফপিএর সহায়তায় বাংলাদেশে ৩ লাখের বেশি মানুষকে শিশুবিয়ে ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কমিউনিটি আলোচনায় যুক্ত করা হয়। ৪৪ হাজারের বেশি কিশোর-কিশোরী জীবনদক্ষতা বিষয়ক শিক্ষা পেয়েছে এবং ২৫টি তরুণ নেতৃত্বাধীন সংগঠনকে কাজের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু সচেতনতা তৈরি করলেই পরিবর্তন আসবে না। তরুণদের কথা বলার সুযোগের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ, নির্ভরযোগ্য এসআরএইচআর তথ্য, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস তাই শুধু তরুণদের উদ্‌যাপনের দিন নয়। এটি একটি প্রশ্ন করার দিনও: তরুণদের কি শুধু কথা বলার জন্য ডাকা হচ্ছে, নাকি তাদের কথা শুনে সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, “ভিন্ন প্রেক্ষাপট, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা” শুধু একটি প্রতিপাদ্য হয়ে থাকবে, নাকি বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণের জন্য বাস্তব সুযোগ তৈরির অঙ্গীকারে পরিণত হবে।

Leave a Reply