প্রজনন স্বাস্থ্য এবং মানসিক সুস্থতার মাঝে অদৃশ্য সুতো

যুগ যুগ ধরে নারীদের শেখানো হয়েছে যে তাদের শরীর এবং মন দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা। তবে বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান সেই ধ্রুব সত্যকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে, যা নারীরা গত কয়েক দশক ধরে মর্মে মর্মে অনুভব করছেন। আমাদের প্রজননতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের মাঝে মিশে আছে এক অদৃশ্য যোগসূত্র, যা অনেকটা দ্বিমুখী এক মহাসড়কের মতো কাজ করে। শরীরের এক প্রান্তের স্পন্দন অন্য প্রান্তে সমানভাবে অনুভূত হয়। 

ঐতিহাসিকভাবে, চিকিৎসা ব্যবস্থা নারীদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলোকে “হিস্টেরিয়া” বলে উপেক্ষা করেছে। এই শব্দটির উৎপত্তি গ্রীক শব্দ ‘জরায়ু’ থেকে। এই অবহেলার কারণে অনেক নারীকে নীরবে কষ্ট পেতে হয়েছে, কিন্তু আমাদের এখন সামগ্রিক বা হলিস্টিক স্বাস্থ্যসেবার দিকে নজর দিতে হবে।

প্রজনন স্বাস্থ্য মানে শুধু কোনো রোগের অনুপস্থিতি নয়, এটি মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি পূর্ণ রূপ। ইরফাত আরা এবং তার সহকর্মীদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত একজন নারীর জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপে প্রজনন স্বাস্থ্য সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই একে একটি বিচ্ছিন্ন বিষয় না ভেবে একটি নিরবিচ্ছিন্ন যাত্রা হিসেবে দেখা উচিত।

মাসিক চক্রের কথা যদি চিন্তা করা হয়, অনেকে পিএমএস (PMS) অনুভব করেন, কিন্তু পিএমডিডি (PMDD) বা প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার সম্পূর্ণ অন্য পর্যায়ের একটি সমস্যা। এটি হরমোনের পরিবর্তনের প্রতি শরীরের একটি তীব্র মানসিক প্রতিক্রিয়া। মাসের পর মাস তীব্র ব্যথা সহ্য করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার যে মানসিক ধকল, তা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। আমাদের শেখানো হয় গরম পানির সেঁক নিয়ে মুখ বুজে সব সয়ে নিতে, কিন্তু শারীরিক ব্যথার এই দীর্ঘস্থায়ী দমন প্রায়ই মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যখন শরীরকে উপেক্ষা করি, মনকে তখন তার মাসুল দিতে হয়।

জীবনের বড় পরিবর্তনের সময় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বন্ধ্যাত্ব এবং গর্ভপাত কেবল শারীরিক যন্ত্রণা নয়, এটি মনের ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ডিপ্রেশন ও অ্যানজাইটি-তে আমাদের সমাজ প্রায়ই গুরুত্বারোপ করতে ব্যার্থ হয়। একইভাবে, প্রসব-পরবর্তী বা পোস্টপার্টাম মুড ডিজঅর্ডার কোনো দুর্বলতা বা ব্যর্থতা নয়। এটি একটি জৈবিক এবং আবেগীয় পরিবর্তন, যার জন্য সঠিক চিকিৎসা এবং সহমর্মিতা প্রয়োজন।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবনের এই “পরিবর্তন” নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। মেনোপজ বা ঋতুনিবৃত্তির সময় এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এটি কেবল শরীরে হঠাৎ গরম অনুভব করা বা ‘হট ফ্লাশ’ নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করে। এর ফলে স্মৃতি বিভ্রম বা “ব্রেইন ফগ” এবং অতিরিক্ত উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। আমাদের উচিত মেনোপজকে অবক্ষয় হিসেবে না দেখে মানসিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা। এটি মস্তিষ্ক এবং শরীরের নতুন একটি ছন্দ খুঁজে পাওয়ার সময়।

যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকারের (SRHR) সাথে এই সম্পর্কের যোগসূত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রকৃত প্রজনন স্বাধীনতার মানে হলো মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অধিকার থাকা। গীতা সেন এবং শ্রীলাথা বাটলিওয়ালার একটি গবেষণা অনুসারে, প্রজনন স্বাস্থ্য হলো একটি “সক্ষমতা” (capability)। অর্থাৎ, এটি একটি মৌলিক হাতিয়ার যা নারীদের তাদের পছন্দের জীবন যাপনে শক্তি যোগায়। যখন যৌন স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হয়, মনও তখন ভেঙে পড়ে। সিজার-ডোরু রাদু এবং একদল গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে যে, যৌন স্বাস্থ্যের সাথে মানুষের মানসিক জীবনযাত্রার মানের একটি গভীর এবং পদ্ধতিগত সম্পর্ক রয়েছে। একজন ডাক্তার  রোগীর  প্রজনন অঙ্গের চিকিৎসা করবেন অথচ তার মনকে উপেক্ষা করবেন, তা হতে পারে না।

তাই এক্সপার্টরা  এমন চিকিৎসক খুঁজে বের করার কথা বলেন,  যারা আমাদের শারীরিক এবং মানসিক লক্ষণগুলোকে সমান গুরুত্ব দেবেন। যদি কোনো ডাক্তার বলেন যে আপনার কষ্ট “একজন নারী হিসেবে স্বাভাবিক,” তবে আপনার উচিত এমন কাউকে খোঁজা যিনি স্বাস্থ্যের এই জটিলতাগুলো বোঝেন।

প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা একজন মানুষকে সামগ্রিকভাবে দেখে। প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা  এটি স্বীকার করে যে, আমাদের হরমোন এবং আমাদের সামগ্রিক ‘Well-being’’-এর  মধ্যকার সুতোটি অত্যন্ত বাস্তব। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে আমরা এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারি, যেখানে নারীদের আর শারীরিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক প্রশান্তির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে না। আমরা শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন অঙ্গের সমষ্টি নই, আমরা একটি সংযুক্ত ব্যবস্থা যা যথাযথ যত্ন এবং গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখি। 

উৎস:

১. ইউএনএফপিএ (UNFPA)

২. টেলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস অনলাইন

৩. মাল্টিডিসিপ্লিনারি ডিজিটাল পাবলিশিং ইনস্টিটিউট (MDPI)

৪. ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ কারেন্ট রিসার্চ ইন ফিজিওলজি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি

Leave a Reply