নীরবতা থেকে স্ক্রিনিং: পুরুষদের টেস্টিকুলার ও প্রোস্টেট স্বাস্থ্য
দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য লজ্জা ও এড়িয়ে চলার আড়ালে চাপা পড়ে আছে। অথচ টেস্টিকুলার ও প্রোস্টেট স্বাস্থ্য সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
টেস্টিকুলার স্বাস্থ্য বলতে অণ্ডকোষের সুস্থতাকে বোঝায়, যেখানে শুক্রাণু ও টেস্টোস্টেরন তৈরি হয়। অন্যদিকে প্রোস্টেট স্বাস্থ্য জড়িত প্রোস্টেট গ্রন্থির সঙ্গে, যা বীর্য উৎপাদন ও মূত্রনালির কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দুই ক্ষেত্রের যেকোনো সমস্যাই উর্বরতা (Fertility), মূত্রত্যাগে স্বাচ্ছন্দ্য এবং সামগ্রিক জীবনমানকে প্রভাবিত করতে পারে।
টেস্টিকুলার সমস্যার মধ্যে টেস্টিকুলার ক্যানসার ছাড়াও অর্কাইটিসের মতো সংক্রমণ এবং ভ্যারিকোসিলের মতো অবস্থা রয়েছে, যেখানে অণ্ডকোষে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। মোট পুরুষদের ক্যান্সার কেসের সংখ্যার তুলনায় টেস্টিকুলার ক্যানসারের হার কম হলেও, ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ পুরুষদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়।
২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে প্রজনন অঙ্গসংক্রান্ত ক্যানসারের হাজার হাজার নতুন রোগী দেখা যায় , যেখানে ওই বয়সে প্রোস্টেট ক্যানসারের তুলনায় টেস্টিকুলার ক্যানসারের সংখ্যাই বেশি ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে টেস্টিকুলার ক্যানসার অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য, এবং দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার হারও বেশ উচ্চ। অন্যদিকে প্রোস্টেট রোগের মধ্যে রয়েছে benign enlargement, যা মূত্রত্যাগে সমস্যা সৃষ্টি করে, প্রোস্টাটাইটিস এবং প্রোস্টেট ক্যানসার। প্রোস্টেট ক্যানসার বর্তমানে বিশ্বে পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি, ২০২২ সালে যার নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ লক্ষেরও বেশি। চিকিৎসা পদ্ধতি রোগভেদে ভিন্ন, কোথাও ওষুধ ও পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট, কোথাও প্রয়োজন হয় অস্ত্রোপচার বা রেডিওথেরাপির। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা নিরাময়যোগ্য।
তবু ‘Below the belt’ স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ রয়ে গেছে, যা পুরুষদের নীরবে কষ্ট সহ্য করতে বাধ্য করে। বাংলাদেশসহ অনেক সমাজেই পুরুষদের প্রজনন অঙ্গ নিয়ে কথা বলা অশোভন বা পুরুষত্বহানিকর মনে করা হয়। ফলে প্রাথমিক উপসর্গ উপেক্ষিত থাকে, আর রোগ ধরা পড়ে দেরিতে।
প্রজনন সুস্থতা কেবল সন্তান ধারণের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শারীরিক ও মানসিক প্রাণশক্তির বিস্তৃত ধারণা, যেখানে হরমোনের ভারসাম্য, যৌন স্বাস্থ্য এবং রোগমুক্ত অবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। গাঁট, ব্যথা বা মূত্রের পরিবর্তনের মতো লক্ষণ উপেক্ষা করলে পুরুষরা সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ হারান।
‘কঠোর থাকাই পুরুষত্ব’ এই মানসিকতার মূল্য চুকাতে হয় ভারীভাবে। চিকিৎসায় দেরি হলে সহজে চিকিৎসাযোগ্য সমস্যাও জীবননাশের ঝুঁকিতে পরিণত হয়, যার প্রভাব পড়ে পরিবার ও সঙ্গীর ওপর, বাড়ে মানসিক ও আর্থিক চাপ।
প্রোস্টেট সমস্যাগুলো সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে বেশি দেখা গেলেও, এগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রোস্টেট ক্যানসারের হার ও এর কারণে অক্ষমতা বেড়েছে, যা মধ্যবয়সী ও বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
স্ক্রিনিং কোনো জটিল বিষয় নয়। নিয়মিত টেস্টিকুলার সেল্ফ-এক্সাম, পিএসএ রক্তপরীক্ষা এবং শারীরিক পরীক্ষা অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। কখন থেকে পরীক্ষা শুরু করা উচিত, সে বিষয়ে পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললেই অনেক ভ্রান্তি দূর হয় এবং মানসিক স্বস্তি আসে।
প্রোস্টেট স্বাস্থ্য ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত মূত্রক্রিয়া ও যৌন সুস্থতার সঙ্গে। দুর্বল প্রস্রাবের ধারা, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ বা অস্বস্তি উপেক্ষা না করে আগেভাগেই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
‘শক্ত থাকতে হবে’ এই প্রচলিত ধারণা পুরুষদের কথা বলতে বাধা দেয়। ফলে সঙ্গী, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সামান্য পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয় না। অথচ কাছের মানুষের সমর্থন ও স্বাভাবিক কথোপকথনই অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার প্রেরণা দেয়।
খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাবও প্রজনন সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার ও চাপ নিয়ন্ত্রণ হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
অনেক সময় প্রজনন সমস্যাই হয় ‘canary in the coal mine’, যা হৃদ্রোগ বা হরমোনজনিত বড় পরিবর্তনের পূর্বসংকেত দেয় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা জানান দেয়।
বিশ্বজুড়ে পুরুষদের প্রজনন অঙ্গসংক্রান্ত ক্যানসারের হার বাড়ছে। বাংলাদেশেও প্রোস্টেট ও টেস্টিকুলার ক্যানসার ক্যানসারজনিত রোগভার ও মৃত্যুহারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এখনই নীরবতা ভেঙে সংলাপ শুরু করার সময়।
পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে আমাদের কথা বলতেই হবে।
সূত্র:
১. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)
২. পাবমেড
৩. দ্যা গ্লোবাল গ্রাফ
