দুই-তিন মাসে স্বাভাবিক হবে সরকারি গর্ভনিরোধক সরবরাহ: পরিবার পরিকল্পনার অন্য ঘাটতিগুলো কাটবে কীভাবে?

৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সারদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, গত তিন বছর ধরে চাহিদার তুলনায় গর্ভনিরোধক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ কিছুটা কম ছিল। এতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তিনি জানান, এসব পণ্য কেনার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশা করছে সরকার।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার বা এসআরএইচআর-এর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ৫৮ শতাংশ কোনো না কোনো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। একই সময়ে ১৮ শতাংশ নারীর পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা পূরণের হার ৭৪ শতাংশ।

তবে সবার পরিস্থিতি এক নয়। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, দরিদ্রতম পরিবারের নারীদের মধ্যে আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা পূরণের হার ৮০ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে তা ৭০ শতাংশ। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৪৫ শতাংশ এবং অপূর্ণ চাহিদা ১৮ শতাংশ।

অর্থাৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি হলেও এটিই পুরো সমাধান নয়।

বাংলাদেশের ফ্যামিলি প্ল্যানিং ২০৩০ অঙ্গীকারেও কিশোর-কিশোরী, প্রসব-পরবর্তী নারী, গর্ভপাত-পরবর্তী সেবা গ্রহণকারী এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতির সহজলভ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য, কাউন্সেলিং এবং কমিউনিটি পর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্জনও কম নয়। ফ্যামিলি প্ল্যানিং ২০৩০-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার নারী আধুনিক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এর ফলে আনুমানিক ৭৯ লাখ ৭০ হাজার অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং ৮ হাজার ৫০০ মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে হিসাব করা হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা করতে চাওয়া একজন মানুষের কাছে গর্ভনিরোধকের সরবরাহ ঘাটতি শুধু ওষুধ বা পণ্য না থাকার বিষয় নয়। প্রয়োজনের সময়ে পছন্দের পদ্ধতি না পাওয়া মানে হতে পারে পরিকল্পনায় ছেদ, অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বা নিয়মিত সেবা থেকে দূরে সরে যাওয়া। তাই আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে গর্ভনিরোধক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক করার সরকারের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সেবায় ধারাবাহিকতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গর্ভনিরোধক ব্যবহারকারীদের প্রায় ৩০ শতাংশ ১২ মাসের মধ্যে একটি পদ্ধতি ব্যবহার বন্ধ করেন। পরিবার পরিকল্পনা সেবার মান উন্নয়নেরও প্রয়োজন রয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে জনবল সংকট। মন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার পদের অনুমোদিত ১ হাজার ৫৪৯টি পদের মধ্যে ৮০৭টি পদই শূন্য। এসব পদ পূরণে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তাই আগামী দুই-তিন মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটিকে শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখলে চলবে না।

গর্ভনিরোধক আবার সরবরাহ ব্যবস্থায় ফিরলেই সংকট শেষ হবে না। প্রয়োজনের সময়ে পছন্দের পদ্ধতি পাওয়া, সঠিক তথ্য ও পরামর্শ পাওয়া এবং কোনো অপ্রয়োজনীয় বাধা ছাড়াই সেবা চালিয়ে যেতে পারাই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার নয়। বাংলাদেশ কি সরবরাহ সংকট কাটিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য, অধিকারভিত্তিক ও মানুষকেন্দ্রিক পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারবে? 

সূত্র TBS NEWS

Leave a Reply