যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া ছেলেদের কথা আমরা কতটা শুনি?
যৌন সহিংসতার শিকার যখন একটি ছেলে, তখন কি সমাজ তার কষ্টকে একই গুরুত্ব দিয়ে দেখে? সে কি বলতে পারে তার সঙ্গে কী ঘটেছে—নাকি ‘ছেলে মানুষ’ হওয়ার চাপ তাকে নীরব থাকতে শেখায়?
বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে যৌন সহিংসতার অভিযোগ নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এমন ঘটনা সামনে এলেও এর পেছনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো পুরোপুরি মোকাবিলা করা হয়নি। মে থেকে আগস্টের মধ্যে সাভারের মাদ্রাসাগুলোতেই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অন্তত সাতটি ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হিসেবে রিপোর্ট হওয়া ৫২ জন ছেলের বেশিরভাগই মাদ্রাসায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মূলত শিক্ষক বা বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।
চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে Awaz Uthao-এরসংগ্রহ করা ২০৯টি বেনামি জবানবন্দিতে। এর ৪০ শতাংশে ধর্মীয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে ৪৯ শতাংশ কওমি এবং ৬ শতাংশ আলিয়া মাদ্রাসা-সংক্রান্ত।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, যার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ থাকার কথা ছিল । অথচ সেখানেই যদি তার শরীর, মর্যাদা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন উঠাতেই হয়—আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কতটা নিরাপদ?
সমস্যাটি শুধু নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।The New Age-এর সম্পাদকীয়তে মাদ্রাসা শিক্ষায় তদারকি ও জবাবদিহিতার বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতার বাইরে থাকা প্রায় ৩০ হাজার কওমি মাদ্রাসার ওপর তাদের কোনো তদারকি নেই। অন্যদিকে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি।
এ অবস্থায় শুধু অপরাধীর শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা, যেখানে একজন ভুক্তভোগীকে দোষারোপ বা অবিশ্বাস না করে তার কথা শোনা হবে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক, স্বাস্থ্য ও আইনি সহায়তার পথ তৈরি করা হবে। নির্যাতনের পর একজন ছেলে যেন আবারও নীরবতা, ভয় বা সামাজিক লজ্জার শিকার না হয়—সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
এখানেই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর)-এর প্রশ্নটি সামনে আসে।
এসআরএইচআর শুধু গর্ভনিরোধ বা প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে নিজের শরীরের ওপর অধিকার, আত্নমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার। তাই এসআরএইচআর নিয়ে কথা বলার সময় ছেলেদের অভিজ্ঞতাকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধের উদ্যোগ হতে হবে সবার জন্য। প্রতিটি ছেলে ও পুরুষের শরীর, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। আর নির্যাতনের পর তাদের নীরব থাকার প্রয়োজন নয়—প্রয়োজন বিশ্বাস, সুরক্ষা, সহায়তা ও ন্যায়বিচার।
