আওয়াজ.বিডি – বাংলাদেশে শিশুর যৌন নির্যাতনের নীরবতা ভাঙতে নতুন উদ্যোগ

একটি শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর কথা বলার মতো নিরাপদ জায়গা না পেলে কী ঘটে? ভয়, লজ্জা, পরিবারের চাপ এবং কী করা উচিত তা না জানার কারণে অনেক ঘটনা গোপনই থেকে যায়। ফলে বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য বন্ধ পরিবেশে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের খুব সামান্য অংশই পুলিশ, আদালত বা গণমাধ্যমের নথিতে আসে।

এই নীরবতার কিছু অভিজ্ঞতা সামনে আনার চেষ্টা করছে নতুন একটি ওয়েবসাইট, awaz.bd। প্ল্যাটফর্মটিতে মানুষ শৈশবে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে জানাতে পারেন। কারও নাম বা পরিচয় প্রকাশের পরিবর্তে এসব তথ্য একত্র করে পরিসংখ্যান আকারে দেখানো হয়।

উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর ওয়েবসাইটটি চালুর পর প্রথম ৭২ ঘণ্টায় ১২৪টি অভিজ্ঞতা জমা পড়েছে।

প্রাথমিক এসব তথ্যে দেখা যায়, ৬৬টি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন ছেলে, যা মোট জমা পড়া ঘটনার ৫৩ শতাংশ। আর ৫৮টি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছিলেন মেয়ে, যা ৪৭ শতাংশ।

প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে বাড়ির পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল আরও ৩৩ শতাংশ ঘটনা। অন্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল জনসমাগমের স্থান, বাণিজ্যিক জায়গা ও পরিবহন।

তথ্যগুলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। যৌন নির্যাতন অনেক সময় একবারের ঘটনা নয়। ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁদের ওপর একাধিকবার নির্যাতন হয়েছে। ৩৬ শতাংশ জানিয়েছেন, ঘটনা একবার ঘটেছিল। আর ১৬ শতাংশ দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন।

১০ শতাংশ ঘটনায় পরিবারের কোনো সদস্যকে নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ১৮ শতাংশ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়েও বিশেষভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির আলাদা তথ্য অনুযায়ী, ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে ৫৬ শতাংশ কওমি মাদ্রাসা এবং ১৯ শতাংশ স্কুলের কথা উল্লেখ করেছেন।

তবে এই তথ্য দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিষ্ঠানেই নির্যাতনের হার বেশি, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এগুলো শুধু জানায়, যারা নাম-পরিচয় গোপন রেখে অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন, তাঁরা কোথায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। বরং এসব তথ্য শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করে।

শিশু যৌন নির্যাতন শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নিজের শরীরের ওপর অধিকারকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রভাব শৈশব পেরিয়েও থাকতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, মানুষের ওপর বিশ্বাস, যৌনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের প্রজনন স্বাস্থ্য ও সিদ্ধান্তের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে শুধু তথ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন গোপনীয় স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা এবং শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা।

এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম নীরবতা ভাঙতে এবং নির্যাতনের ধরন সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সেবা বা নির্ভরযোগ্য তদন্তের বিকল্প নয়।

নির্যাতনের গোপন অভিজ্ঞতাগুলো দৃশ্যমান করা কেবল শুরু। আসল পরীক্ষা হলো, এসব তথ্যের পর প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা শুনবে, কী ব্যবস্থা নেবে এবং কীভাবে শিশুদের নিরাপদ রাখবে। যাতে আরেকটি প্রজন্মকে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নীরব থাকতে না হয়। 

নির্যাতনের কোনো অভিজ্ঞতা জানাতে চান? অনুগ্রহ করে ভিজিট করুন: https://awaz.bd/

Leave a Reply