গর্ভাবস্থায় স্থূলতা: সন্তানসম্ভবা হলে মায়ের ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ
গর্ভাবস্থার খবরটি অনেক পরিবারের জন্য আনন্দের। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে এক অদৃশ্য ঝুঁকি—অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, গর্ভধারণের আগে বা গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যদি কারও বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩০ বা তার বেশি হয়, তাহলে তাকে স্থূলতা হিসেবে ধরা হয়। আর এই অতিরিক্ত ওজন মা ও গর্ভের শিশুর জন্য নানা জটিলতার কারণ হতে পারে।
স্থূলতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। কারও ক্ষেত্রে জিনগত প্রভাব থাকে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে স্থূলতা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়—এসবও বড় ভূমিকা রাখে। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা বা চলাফেরা কম থাকাও ওজন বাড়ায়। কিছু হরমোনজনিত সমস্যা, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) বা হাইপোথাইরয়েডিজম, নারীদের স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। নিম্ন আয়ের পরিবারে পুষ্টিকর খাবারের অভাব বা সচেতনতার ঘাটতিও একটি কারণ।
গর্ভাবস্থায় স্থূলতা মায়ের শরীরে নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া (গর্ভকালীন জটিলতা), এমনকি প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রসব কঠিন হয়ে পড়ে, সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হয়।
শুধু মা নন, শিশুও ঝুঁকির বাইরে নয়। অতিরিক্ত ওজনের মায়ের ক্ষেত্রে বড় আকারের শিশু (ম্যাক্রোসোমিয়া) জন্মানোর সম্ভাবনা বেশি। এতে প্রসব জটিল হতে পারে। জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও কিছুটা বাড়ে। এমনকি মৃতপ্রসবের ঘটনাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। গবেষণা বলছে, যেসব মায়ের গর্ভাবস্থায় স্থূলতা থাকে, তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যতে স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেশি হতে পারে।
তবে সুখবর হলো—সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সবচেয়ে ভালো হয় গর্ভধারণের আগেই ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করা উচিত। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ‘দুজনের জন্য খেতে হবে’—এই ধারণা ঠিক নয়। বরং সুষম, পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ—এসব খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। চর্বিযুক্ত ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কমাতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম—যেমন হাঁটা—গর্ভাবস্থায় নিরাপদ এবং উপকারী। একই সঙ্গে নিয়মিত ওজন মাপা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
প্রসবের পরও যত্ন জরুরি। স্তন্যপান করানো মায়ের ওজন কমাতে সহায়তা করে এবং শিশুর জন্যও উপকারী। ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তায় ফিরে গেলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল মেলে।
গর্ভাবস্থা একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে অতিরিক্ত ওজনকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। সচেতনতা, সঠিক পরামর্শ এবং পরিবার ও চিকিৎসকের সহযোগিতায় একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ সুস্থ মা মানেই সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।