‘সহজ পথ’ সবসময় নিরাপদ নয় – সিজারিয়ান সংস্কৃতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হুমকির মুখে

বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে সম্প্রতি যে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তা হলো- প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশনের হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সিজারিয়ান সেকশন একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার- যার সঠিক প্রয়োগে মা ও শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটি অনেকাংশে বাণিজ্যিক চিকিৎসার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই দশকে সি-সেকশনের হার এমনভাবে বেড়েছে যে, এখন প্রতি দুজন শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় একটি হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে বলছে, কোনো দেশে সি-সেকশনের গ্রহণযোগ্য হার ১০-১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয় সেখানে, বাংলাদেশের এ হার বর্তমানে বিশ্বমানের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট প্রসবের প্রায় ৫১.৮ শতাংশই হয়েছে সিজারিয়ানের মাধ্যমে। ২০০৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। মাত্র দুই দশকে বেড়েছে ১২ গুণ।  যা ভয়ঙ্কর রকমের এক অস্বাভাবিক লাফ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ সি-সেকশনই হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে যেখানে স্বাভাবিক প্রসব এখনো তুলনামূলক বেশি, সেখানে বেসরকারি ক্লিনিকগুলো প্রায় সি-সেকশন নির্ভর জন্মকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর বড় বড় হাসপাতালগুলোতে এ হার অনেক সময় ৭০-৯০ শতাংশকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, বেসরকারি চিকিৎসা খাত এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়া এখন আর ‘স্বাভাবিক’ কোনো প্রসিডিউর নয়- উল্টো ‘ব্যতিক্রম’ কোনো উদাহরণ মনে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন মা ও শিশুর জন্য বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। অস্ত্রোপচারের কারণে ইনফেকশন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যতের গর্ভধারণের ক্ষেত্রে জটিলতা বেড়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা দেয় শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা ও জন্ম-পরবর্তী দুর্বলতা। বাংলাদেশে এ বিষয়গুলোকে প্রায় অগ্রাহ্য করা হচ্ছে।
এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই রোগী বা পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত তথ্য না দিয়েই সি-সেকশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনেক হাসপাতাল স্বাভাবিক প্রসবের সুযোগ রাখে না বললেই চলে, কারণ তাতে সময় বেশি লাগে, চিকিৎসককে দীর্ঘ সময় উপস্থিত থাকতে হয়, আর আয় তুলনামূলক কম। ফলে ‘সময় বাঁচানো ও লাভ বাড়ানো’- এই দুই যুক্তিতে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন এখন প্রাতিষ্ঠানিক অনৈতিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি নির্ধারণের সদিচ্ছার ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সি-সেকশন চিকিৎসার প্রয়োজনীয় হাতিয়ার, কিন্তু যখন সেটি আর্থিক প্রলোভনের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা চিকিৎসার মহৎ উদ্দেশ্যকে কলঙ্কিত করে। সরকার, চিকিৎসক সমাজ, গণমাধ্যম এবং জনগণ- সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে এই প্রবণতা রোধ করতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামতে হবে, মনিটরিং ও জবাবদিহি জোরদার করতে হবে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে তাদের চিকিৎসা নৈতিকতা পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, আর জনগণকে বুঝতে হবে- ‘সহজ পথ’ সবসময় নিরাপদ নয়।

Leave a Reply