সরকারি জন্মনিরোধকের সংকট প্রবল, সেই সাথে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের ঝুঁকি
ইনজেকশনটি তিন মাস নিশ্চিন্ত রাখার কথা, সেটিও মজুত শেষ। অনেকের কাছে বিষয়টি হয়তো কেবল একটি প্রশাসনিক ঘাটতি। কিন্তু তৃণমূলের নারীর জন্য এটি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
দেশের ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকায় সরকারিভাবে সরবরাহ করা জন্মনিরোধক সামগ্রী ইতিমধ্যে ফুরিয়ে গেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৩৯৭টি উপজেলায় কনডম পুরোপুরি স্টক-আউট। অন্তত ২২০টি উপজেলায় খাওয়ার বড়ির মজুত নেই। সব উপজেলাতেই ইমপ্ল্যান্টের ঘাটতি। ৩৫৩টি উপজেলায় আইইউডি নেই, ১৬৯টিতে ইনজেকশন শেষ।
এই সংকট নতুন নয়। ২০২০ সালের পর থেকে সরবরাহে ঘাটতি ছিলই। তবে গত এক বছরে তা প্রকট হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারিতে যেখানে ৫৩ লাখের বেশি কনডম সরবরাহ হয়েছিল, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা নেমে এসেছে প্রায় সাড়ে সাত লাখে—৮৫ শতাংশের বেশি হ্রাস। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘কিছু কিছু জেলায় এক বছরের বেশি সময় ধরে টানাপোড়েন চলছে।’
এর প্রভাব ইতিমধ্যে পরিসংখ্যানে ধরা পড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে—পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ঊর্ধ্বগতি। একই সঙ্গে জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আধুনিক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও কমেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম মনে করেন, এই দুটি প্রবণতা পরস্পর-সংযুক্ত। জন্মনিরোধক কমলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বাড়ে, আর তা প্রজনন হারকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবার বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। কারণ বাজার থেকে কিনে নেওয়ার সামর্থ্য সবার নেই।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার একটি বড় ক্রয় প্রকল্প অনুমোদন পেলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে অন্তত চার মাস লাগবে। এর মধ্যে সীমিত পরিসরে কিছু কনডম ও বড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরাই স্বীকার করছেন, তা দিয়ে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ আছে। করোনা মহামারির সময় ব্যবহার কমে গেলেও ক্রয় পরিকল্পনা সমন্বয় হয়নি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি একটি বড় স্বাস্থ্যখাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর কেনাকাটায় ছেদ পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে মজুত কমতে কমতে এখন তলানিতে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সক্রিয়তা, নারীর অংশগ্রহণ ও সচেতনতা—সব মিলিয়ে একটি সাফল্যের গল্প তৈরি হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় হোঁচট খেলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ অর্জনের পথও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা নয়; এটি নীতিগত অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। পরিবার পরিকল্পনা খাতকে পুনরায় গুরুত্ব না দিলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দুই-তিন বছর পর আরও স্পষ্ট হবে।
গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেই খালি তাক তাই কেবল একটি শূন্যতা নয়। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে—পরিকল্পিত ভবিষ্যতের জায়গায় আবারও অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনাচ্ছে। এখন প্রশ্ন, দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে এই ছেদ কতটা দ্রুত মেরামত করা যায়।
সোর্স – ডেইলি স্টার
