মাসিক দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে চেকিয়ার উদ্যোগ

এ বছরের শুরু  থেকে চেক প্রজাতন্ত্রজুড়ে স্কুলগুলো একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন কার্যকর করেছে , যা হাজারো জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। স্কুলের টয়লেটগুলোতে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড ও ট্যাম্পন রাখা হচ্ছে । সার্ভিসটি ভোগ করতে লাগবেনা কোনো ফরম পূরণ, কোনো প্রশ্ন। আন্দোলনকারীরা বলছে এটি দানের বিষয় নয়; এটি মর্যাদার প্রশ্ন।

“আমরা মনে করি, আমরা কেবল মাসিক দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে নয়, মাসিকের মর্যাদার জন্য লড়ছি,” বলেন লুসি গ্রেগোরোভা। তিনি ‘সোলা পোমাহা’ নামের অলাভজনক সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা, যে সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে মাসিক সামগ্রী বিতরণ করছে এবং বিষয়টিকে জনপরিসরের আলোচনায় আনতে কাজ করছে। 

গৃহহীন নারীদের সহায়তা দিয়ে যে কাজ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই একটি বড় সমস্যার ছবি সামনে আনে। গ্রেগোরোভার ভাষায়, মাসিক দারিদ্র্য কেবল গৃহহীন নারীদের নয়, একক মায়েদের, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মেয়েদের এবং এমন শিক্ষার্থীদেরও প্রভাবিত করে, যাদের প্রয়োজনের সময় অর্থ বা তথ্যের নাগাল থাকে না।

মাসিক দারিদ্র্য বলতে মাসিক সামগ্রী, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অথবা এসবের একাধিকটির অভাবকে বোঝায়। বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৫০ কোটি মানুষ এর প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, চেকিয়ার প্রতি তিনজন নারীর একজন মাসিককে আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখেন। সোলা পোমাহার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯০ হাজার মেয়ে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মাসিক দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে পারে। যারা এর শিকার, তাঁদের জন্য এর প্রভাব স্পষ্ট। এর অর্থ ক্লাস মিস করা, উদ্বেগ বা anxiety-তে ভোগা, টয়লেট পেপার দিয়ে সামাল দেওয়ার অপমান, কিংবা নীরবে কষ্ট সহ্য করা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশে পরিবর্তনের মাধ্যমে চালু হওয়া নতুন নীতিতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে তাদের অন্তত অর্ধেক টয়লেটে বিনামূল্যে মাসিক সামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। এর খরচ তুলনামূলকভাবে কম, প্রতি স্কুলে বছরে কয়েক শ ইউরোর মধ্যেই সীমিত। অস্ট্রাভা ও লিবেরেকের মতো শহরে পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো দেখিয়েছে, এটি সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অ্যাক্টিভিস্টদের মতে সাবানের মতোই মাসিক সামগ্রীও স্বাভাবিক ও সহজলভ্য হওয়া উচিত।

গ্রেগোরোভা বলেন, “Free Access মানে হলো, কাউকে কিছু না বলেই আপনি আপনার মাসিক এর সিচুয়েশনটি সামলাতে পারবেন।” এতে বিশেষ করে স্কুলজীবনে থাকা কিশোরীদের ঘিরে থাকা লজ্জা ও সংকোচ দূর হয়।

এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও দেখা গেছে দেশটিতে। কেউ কেউ একে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বলে দেখেন, আবার কেউ তথাকথিত নারীবাদী বিশেষাধিকার হিসেবে আখ্যা দেন। তবু জরিপগুলোতে দেখা যায়, জনসমর্থন ব্যাপক। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, এর সুফল শুধু পরিচ্ছন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাসিককে স্বাভাবিক করে তোলা স্কুলকে আরও নিরাপদ করে, মানসিক সুস্থতা বাড়ায় এবং অনুপস্থিতি কমায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি সেই কথোপকথন শুরু করছে, যা চেক সমাজ দীর্ঘদিন এড়িয়ে এসেছে। মাসিক এখনো দেশটির বড় ট্যাবুগুলোর একটি, এমন একটি বিষয় যা মানুষ উচ্চারণ করতেই চায় না। মাসিককে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখিয়ে স্কুলগুলো মানবদেহের প্রতি, সহপাঠীর প্রতি এবং মৌলিক মানবিক প্রয়োজনের প্রতি সম্মান শেখাচ্ছে।

চেকিয়ার এই উদ্যোগ এক রাতেই মাসিক দারিদ্র্যের অবসান ঘটাবে না। তবে এক একটি ট্যাম্পনের মাধ্যমে এটি নীরবতার একটি চক্র ভাঙছে এবং দেখাচ্ছে, ছোট ও বাস্তবসম্মত পরিবর্তনও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

সূত্র: রিপোর্টিং ডেমোক্র্যাসি

Leave a Reply