বৈবাহিক ধর্ষণ: বাংলাদেশি নারীদের কি আইন সুরক্ষা দেয়?
বাংলাদেশের অনেক নারীর কাছে নিজ ঘর কোনো নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং অনেকের কাছে তা নিরব যন্ত্রণার এক জায়গা। বাংলাদেশ মেয়েদের শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বেশ এগিয়ে গেলেও, বেডরুমের চার দেয়ালের ভেতর এখনো এক অন্ধকার আইনি শূন্যতা রয়ে গেছে। ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ শব্দটি প্রায়ই ‘পাশ্চাত্য ধারণা’ বলে উল্লেখ করা হয় , কিন্তু এটি হাজার হাজার নারীর কাছে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। অথচ আমাদের আইনি ব্যবস্থা এখনো এই বিষয়টি এড়িয়ে চলছে।
এই অবিচারের মূলে রয়েছে Penal Code 1860-এর Section 375, যা ঔপনিবেশিক আমলের একটি অবশিষ্টাংশ। আইন অনুযায়ী সম্মতিহীন যৌন মিলনই ধর্ষণ, কিন্তু এতে একটি ভয়াবহ ব্যতিক্রম রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো পুরুষ যদি তার নিজের স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং স্ত্রীর বয়স যদি ১৩ বছরের বেশি হয়, তবে একে ধর্ষণ হিসেবে বিচার করা যাবে না। এই ‘বৈবাহিক ব্যতিক্রম’ মূলত একজন স্বামীকে তার স্ত্রীর সম্মতি উপেক্ষা করার এক আইনি লাইসেন্স দেয়। এখানে নারীর শরীরকে একজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়।
পরিসংখ্যানগুলোও এক হৃদয়বিদারক তথ্যের সংকেত দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিনজন নারীর একজন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন, যা প্রায়ই ঘটে ‘Intimate Partner’ এর দ্বারা। বাংলাদেশে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। রুচিরা তাবাসসুম নাভেদের গবেষণায় দেখা গেছে, শহর এলাকায় ৩৭ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে অবিশ্বাস্যভাবে ৫০ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময় যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২৭.৩ শতাংশ নারী তাদের স্বামীর মাধ্যমে জোরপূর্বক যৌন মিলনের শিকার হয়েছেন।
এই আইনি শূন্যতার চরম মূল্য আমাদের আদালতগুলোতেও দেখা যায়। ২০১৬ সালের ‘মরিয়ম খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় ভুক্তভোগী মারাত্মক শারীরিক আঘাত পেলেও, আসামিকে বাঁচাতে বৈবাহিক ব্যতিক্রমী আইনটি ব্যবহার করা হয়েছিল। একইভাবে ২০১০ সালের ‘সালমা খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় আদালত এই ব্যতিক্রমটি বহাল রাখে। এটি এই ধারণাকেই পোক্ত করে যে বিয়ে মানেই যেন স্থায়ী সম্মতির একটি চুক্তি। সম্ভবত সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো ১৪ বছর বয়সী বাল্যবধূ নুরুন্নাহারের ঘটনা। সে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট জখমে মারা যায়, কিন্তু বিবাহিত হওয়ার কারণে তার স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা তুলে ধরেছে কেন এই পরিবর্তন এতো কঠিন। জাফরিন মাহমুদ এবং জোসিন্টা জিনিয়ার (২০২১) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অনেকে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে নয়, বরং একটি ‘নারীবাদীদের তৈরি ধারণা’ হিসেবে দেখেন। তাদের গবেষণা দেখায় যে, সামাজিক নিয়মগুলো প্রায়ই স্ত্রীকে তার ‘দাম্পত্য অধিকার’ নিয়ে অভিযোগ করতে বাধা দেয়। এই মানসিকতা নারীকে নির্যাতনের এক চক্রে আটকে ফেলে। এছাড়া নাজমুল হাসান তার ২০২৫ এর গবেষনায় দেখান যে, এই আইনি নীরবতা সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মতো দেশের তুলনায় যারা ১৯৯১ সালেই একে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এটি কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকারের (SRHR) একটি বড় সংকট। জোরপূর্বক যৌন মিলন অনিচ্ছাকৃত গর্ভাবস্থা, যৌনবাহিত সংক্রমণ এবং বিষণ্নতার মতো গভীর মানসিক ট্রমার সাথে সরাসরি যুক্ত। বিয়ের ভেতরে ‘না’ বলার অধিকার না থাকলে, নারীরা তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
এখন সময় এসেছে এই নীরবতা ভাঙার। এটা স্বীকার করার সময় এসেছে যে ধর্ষণ মানেই ধর্ষণ, বিয়ের সার্টিফিকেট সেখানে কোনো ঢাল হতে পারে না। আমাদের অবশ্যই ৩৭৫ ধারা সংশোধন করতে হবে এবং প্রতিটি নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। আইনের দোহাই দিয়ে কোনো নারীকেই তার নির্যাতনকারীর সাথে থাকতে বাধ্য করা উচিত নয়।
উৎস:
১. সৌদি জার্নাল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস
২. স্প্রিঞ্জার নেচার
৩. ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসার্চ (IJR)
