প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা: নতুন শিশু এলো ঘরে, মায়ের মন কি ভালো আছে?

শিশুর জন্মের পর ঘরভর্তি আনন্দ। আত্মীয়স্বজনের ভিড়, নতুন কাপড়, ছবি তোলা, শুভেচ্ছা—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকে ছোট্ট মানুষটি। কিন্তু এই আনন্দের ভিড়ে অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায় আরেকজন—শিশুটির মা।

সন্তান জন্মের পর মায়ের শারীরিক যত্ন নিয়ে আমরা তুলনামূলকভাবে সচেতন। কিন্তু তার মানসিক অবস্থার খোঁজ কজন রাখি?

চিকিৎসকেরা বলছেন, সন্তান জন্মের পর অনেক নারী আচমকা মন খারাপ, কান্না পেয়ে যাওয়া, শূন্যতা বা অস্থিরতায় ভুগতে পারেন। প্রথম কয়েক দিন এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। গর্ভাবস্থায় শরীরে যে হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, সন্তান জন্মের পর তা দ্রুত কমে আসে। এই হঠাৎ পরিবর্তন মনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন এই মন খারাপ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়। তখন সেটি প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আরমানা ইসলাম বলেন, “সব মা এই সমস্যায় ভোগেন না। তবে যাদের আগে থেকে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতার ইতিহাস বা পারিবারিক মানসিক রোগের পটভূমি আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি।”

শুধু হরমোন নয়, আরও অনেক কারণ এতে জড়িত। ঘুমের ঘাটতি, অপুষ্টি, থাইরয়েডের সমস্যা, আর্থিক চাপ, পরিবারে সহযোগিতার অভাব—সব মিলিয়ে একজন নতুন মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুকে ঘিরেই সবাই ব্যস্ত। মা ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না, বিশ্রাম পাচ্ছেন কি না—সেটা গুরুত্ব পায় না।

প্রসবের পর বিষণ্ণতার কিছু লক্ষণ হলো—কারণ ছাড়াই কান্না পাওয়া, নিজেকে অসহায় মনে হওয়া, ঘুম না আসা বা অতিরিক্ত ঘুম, অরুচি বা অতিরিক্ত খাওয়া, কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, এমনকি নিজের বা শিশুর ক্ষতি করার চিন্তা আসা। কারও কারও মনে হতে পারে, সন্তান যেন নিজের নয়। এই অনুভূতিগুলো খুবই কষ্টদায়ক এবং ভয়ংকর হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং পেলে এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রয়োজনে ওষুধও দিতে হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে লজ্জা বা ভয় না পেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

প্রতিরোধেও কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিজের অনুভূতি চেপে না রেখে কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলা। দ্বিতীয়ত, একা না থাকা—বিশ্বস্ত মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো। তৃতীয়ত, নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ না নেওয়া। সন্তান জন্মের পর অন্তত ছয় সপ্তাহ সময়টিকে শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের সময় হিসেবে দেখা উচিত। আর সবচেয়ে জরুরি হলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার।

আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় শিশুর যত্নের ওপর জোর দেওয়া হয়—যা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সুস্থ মা ছাড়া সুস্থ শিশুর বেড়ে ওঠা সম্ভব নয়। মায়ের ঘুম, খাবার, মানসিক স্বস্তি—সবই শিশুর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

নতুন প্রাণের আগমনে আনন্দ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সহমর্মিতা। প্রশ্নটা তাই সহজ—শিশুর হাসির পাশে আমরা কি মায়ের মনটাকেও দেখছি?

Leave a Reply