ডিজিটাল নির্যাতন: তিন বছরে ৬০ হাজারেরও বেশি নারী সাইবার অপরাধের শিকার!
ডিজিটাল নির্যাতন আসলে কী? এটা আজকাল আমাদের অনেকের কাছেই নতুন আবার অনেকের কাছেই খুব পরিচিত একটা নাম। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে হাতে একটা স্মার্টফোন থাকা মানে পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেট যেমন আমাদের জীবনযাত্রা অনেক সহজ করে দিয়েছে, ঠিক তেমনি এর একটা অন্ধকার দিকও আছে, সেটা হলো ডিজিটাল নির্যাতন বা অনলাইন সহিংসতা। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশন উইমেনের (ইউএন উইমেন) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এখন এই বিষয়ের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ এটি সারা বিশ্বেই দ্রুত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সহজভাবে বলতে গেলে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে যখন কাউকে ভয় দেখানো, হেনস্থা করা বা মানসিক আঘাত দেওয়া হয়, সেটাই হলো ডিজিটাল নির্যাতন।
এর প্রভাব মূলত নারী ও মেয়েদের উপর খুব বেশি। অনলাইনে সামান্য একটা পোস্টের জন্যেও একজন মানুষকে কত ভয়ানক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না! এই নির্যাতনের ধরনগুলো নানা রকম হতে পারে। যেমন, কারো ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও তার অনুমতি ছাড়াই অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাকে সাধারণত রিভেঞ্জ পর্ন বলে। এছাড়াও, অনলাইনে খারাপ মন্তব্য বা হুমকি দিয়ে সাইবারবুলিং করা একটি সাধারণ ঘটনা। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে তৈরি করা নকল ছবি বা ভিডিও অর্থাৎ ডিপফেক দিয়ে মানহানি করার ঘটনাও খুব বাড়ছে।
আবার কারো ব্যক্তিগত তথ্য, যেমন ঠিকানা বা ফোন নম্বর, ফাঁস করে দেওয়া হয়, যাকে বলা হয় ডক্সিং, যা মানুষকে চরম বিপদে ফেলে। এমনকি অনলাইনে পিছু নেওয়া বা নজরদারি করা (স্টকিং)-এর মতো ঘটনাও ঘটে। আসলে, এই অনলাইন সহিংসতা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি বাস্তবেও শারীরিক নির্যাতন, হয়রানি বা মারাত্মক মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে তাদের কাছে সাইবার অপরাধের শিকার ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী প্রতিকার চেয়েছেন। সাইবার স্পেসে ভুক্তভোগী এসব নারীর ৪১ ভাগই ডক্সিংয়ের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮ ভাগ ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭ ভাগ ব্ল্যাকমেইলিং, ৯ ভাগ ইমপার্সোনেশন, ৮ ভাগ সাইবার বুলিংজনিত সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই প্রাথমিক পর্যায়ে বুঝতে পারেন না কী করবেন বা কোথায় গেলে প্রতিকার পাবেন। এমনকি তারা প্রাথমিক পর্যায়ে অভিভাবক বা পরিচিতজনকেও বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে চান না।
আসলে এই সমস্যাটা জটিল হওয়ার পেছনে আরও বেশ কিছু কারণ আছে। প্রথমত, এই অপরাধীরা বিভিন্ন ছদ্মনামে বা দেশের বাইরে থেকে তাদের কাজ চালায়। ফলে অপরাধী কে, সেটা খুঁজে বের করা বা তাকে আইনের আওতায় আনা বেশ কঠিন হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, টেক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম দ্রুততার সঙ্গে আপত্তিকর কন্টেন্ট সরানোর ক্ষেত্রে প্রায়শই তাদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যায়; তাদের কন্টেন্ট অপসারণের প্রক্রিয়াও অনেক সময় ধীরগতির হয়। আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকলেও, ডিজিটাল নির্যাতনের সব ধরনের ঘটনাকে স্পষ্টভাবে আইনি স্বীকৃতি দিতে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তাছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে দ্রুত নতুন উপায়ে নির্যাতন ছড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
নারী ও শিশুসহ সবার জন্য ডিজিটাল জগতকে নিরাপদ করে তুলতে হবে। আর এটি করার জন্য আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমত, আমাদের নিজেদেরকেই আগে অনলাইনে আরও বেশি সচেতন হতে হবে এবং যারা সাইবার নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তাদের পাশে থেকে সাহস যোগাতে হবে। আমরা সবাই যদি আমাদের সরকার এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে আরও কঠোর ও কার্যকর আইন এবং নিরাপদ প্ল্যাটফর্মের দাবি জানাই, তবেই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
আমাদের সকলের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল প্রতিবাদই পারে নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই!
উৎস : দৈনিক যুগান্তর ও ইউএন উইমেন-এর ওয়েবসাইট
