আইন আছে, প্রয়োগ কই? বাল্যবিবাহের দুষ্টচক্রে আজও আটকে আছে দেশের লাখো কিশোরীর ভবিষ্যৎ

সাতক্ষীরার একটি স্কুলে এক বছরে ৫০টি বাল্যবিবাহ—খবরটি প্রকাশের পর অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, এ চিত্র নতুন নয়। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতার ভয়, যৌতুকের চাপ—সব মিলিয়ে কিশোরীদের শৈশব এখনো ঝুঁকির মুখে।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ২০১৭–১৮ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রায় ৫৯ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগেই। ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে ২২ শতাংশের। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় ৩১ শতাংশ ইতিমধ্যে সন্তানসম্ভবা বা মা হয়েছেন। করোনা মহামারির সময় বাল্যবিবাহ আরও বেড়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর—এই সাত মাসে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। গড়ে দিনে ৬৫টি।

আইন আছে। ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী, মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর। তবু বাস্তবে গোপনে বিয়ে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন বা বয়সের কাগজে কারচুপি করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি দুর্বল। ইউনিয়ন পরিষদে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও কার্যকর ভূমিকা সব সময় দেখা যায় না।

কেন এই প্রবণতা থামছে না? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল কারণগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য বড় একটি বিষয়। পরিবার মনে করে, মেয়েকে বিয়ে দিলে খরচ কমবে। নিরাপত্তাহীনতার ভয়ও কাজ করে—যৌন হয়রানি, অপহরণ বা ‘সম্মান’ হারানোর আশঙ্কা থেকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। অনেকের ধারণা, অল্প বয়সে বিয়ে দিলে যৌতুক কম লাগে। বয়স বাড়লে দাবিও বাড়ে। ফলে শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, মেয়েরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায় না।

যৌতুক এখনো বড় সমস্যা। আইন থাকলেও সামাজিকভাবে এটি অনেক জায়গায় স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়। বিয়ের সময় নগদ টাকা, আসবাব, মোটরসাইকেল—বিভিন্ন দাবি ওঠে। বিয়ের পরও যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। মেয়ের পরিবার অনেক সময় সম্পত্তিতে সমান অধিকার না দিয়ে যৌতুক দিয়েই দায় শেষ করতে চায়। এতে বৈষম্য আরও পোক্ত হয়।

বাল্যবিবাহের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। অল্প বয়সে গর্ভধারণে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। দুই সন্তানের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিরতি থাকে না। শিক্ষা থেমে যায়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসে না। একসময় এটি দুষ্টচক্রে পরিণত হয়—দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও নির্ভরশীলতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে।

সমাধান কী? প্রথমত, আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে। বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবারকে বোঝাতে হবে—মেয়ের শিক্ষা খরচ নয়, বিনিয়োগ। একই সঙ্গে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিভাবকের ভয় কমে।

সবচেয়ে বড় কথা, মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। মেয়েকে ‘অস্থায়ী অতিথি’ নয়, সমান অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক শুধু একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি জাতীয় সমস্যা। এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সত্যিই আমাদের মেয়েদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ চাই?

Leave a Reply